কৃষি বার্তা

আম বাগানে চুই ঝাল: চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন কৃষি সম্ভাবনার দিগন্ত

  মোঃ অনিক দেওয়ান, স্টাফ রিপোর্টার: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ৫:২৯:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

চুই ঝাল বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী মসলাজাত ফসল। এটি মূলত লতাজাত উদ্ভিদ, যার কাণ্ড ও শিকড় রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাদে ঝাঁঝালো হলেও সাধারণ মরিচের মতো অতিরিক্ত ঝাল নয়। বরং চুই ঝালের বিশেষ ঘ্রাণ ও তীক্ষ্ণ স্বাদ বাঙালি রান্নায় যোগ করে ভিন্নমাত্রা। মাংস, মাছ কিংবা সবজি—সব ধরনের রান্নাতেই চুই ঝালের ব্যবহার খাদ্যরসিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বরিশাল অঞ্চলে চুই ঝালের চাষ হয়ে আসছে। ঐতিহ্যগতভাবে এসব অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে চুই ঝাল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই মসলাজাত ফসল এখন নতুন দিগন্তে পা রাখছে। উত্তরাঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুতে চুই ঝালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে এগিয়ে এসেছেন এক উদ্যোক্তা। তারই অংশ হিসেবে আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় আম বাগানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শুরু হয়েছে চুই ঝাল চাষ।

শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক আহসান হাবিব দুই বছর আগে চুই ঝাল চাষের উদ্যোগ নেন। স্থানীয় একজন পরিচিতের কাছ থেকে চুই ঝালের চারা সংগ্রহ করে তিনি তার আম বাগানে প্রথম দফায় প্রায় ৪০০টি চারা রোপণ করেন। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব ও বর্ষা মৌসুমের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় অর্ধেক গাছ নষ্ট হয়ে যায়। হাল না ছেড়ে তিনি নিজ উদ্যোগে নতুন চারা উৎপাদন করেন এবং পুনরায় আম বাগানে চুই ঝাল রোপণ শুরু করেন। ধীরে ধীরে গাছগুলো বেড়ে উঠতে থাকে। দুই বছরের মাথায় তার বাগানে চুই ঝালের লতা ও গাছের অবস্থা দেখে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আম বাগানের প্রতিটি গাছের গোড়ায় চুই ঝালের চারা লাগানো হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের চুই ঝালের লতা আম গাছকে জড়িয়ে উপরের দিকে উঠছে। সাধারণত চুই ঝাল লতাজাত ফসল হওয়ায় এর জন্য খুঁটি বা আলাদা কাঠামোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু আম গাছকে প্রাকৃতিক অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করায় আলাদা কোনো খুঁটি নির্মাণ করতে হয়নি।

আহসান হাবিব জানান, এতে একদিকে উৎপাদন খরচ কমেছে, অন্যদিকে একই জমি থেকে দুই ধরনের ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে আম বাগানের নিচের জায়গা অনেকটাই অব্যবহৃত থাকত, এখন সেই জায়গা কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত আয় সম্ভব হচ্ছে।

তিনি বলেন, “রাজশাহী বিভাগের মধ্যে প্রথম আমিই বাণিজ্যিকভাবে আম বাগানে চুই ঝাল চাষ শুরু করেছি। একটি আম গাছের গোড়ায় তিনটি করে চুই ঝাল গাছ লাগানো হয়েছে। তিন বছর পর প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে পাঁচ কেজি করে চুই ঝাল পাওয়া গেলে একটি আম গাছ থেকেই প্রায় ১৫ কেজি চুই ঝাল উৎপাদন সম্ভব।”

তার মতে, বাজারে চুই ঝালের ভালো চাহিদা রয়েছে, ফলে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। পরিচর্যা তুলনামূলক কম এবং এখন পর্যন্ত বড় ধরনের রোগবালাইও দেখা যায়নি। লতার বৃদ্ধি সন্তোষজনক এবং এই অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুর সঙ্গে চুই ঝাল ভালোভাবেই মানিয়ে নিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি মূলত আমনির্ভর। বছরে নির্দিষ্ট সময়েই আম থেকে আয় হয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারদরের ওঠানামায় কৃষকরা ঝুঁকিতে পড়েন। এই বাস্তবতায় আম বাগানে চুই ঝালের মতো নতুন ফসল যুক্ত হলে কৃষকের আয় বৈচিত্র্য আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আহসান হাবিব বলেন, “এই ধরনের সমন্বিত চাষ পদ্ধতি কৃষকের মৌসুমি ঝুঁকি কমাবে। আমের পাশাপাশি নতুন একটি মসলাজাত ফসল কৃষকের হাতে আসবে, যা বার্ষিক আয়কে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল করবে।”

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নয়ন মিয়া বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মসলাজাত ফসল চুই ঝাল যখন উত্তরের আম বাগানে জায়গা করে নিচ্ছে, তখন এটি শুধু একটি নতুন ফসল নয়; বরং পরিবর্তিত কৃষি বাস্তবতায় অভিযোজনের একটি দৃষ্টান্ত।”

তিনি জানান, বর্তমানে শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় তিন হেক্টর জমিতে চুই ঝাল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ও বসতবাড়িভিত্তিক চাষ দুটিই রয়েছে। আম বাগানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে চাষ করলে উৎপাদন খরচ কমে আসে এবং লাভের সম্ভাবনা বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আগামীতে চুই ঝাল চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব এবং বাজারজাত ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত চারা সরবরাহ এবং বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এই অঞ্চলে চুই ঝাল চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের মতে, শিবগঞ্জে আম বাগানে চুই ঝাল চাষের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিতে নতুন পরিচয় যোগ করতে পারে। আমনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে এই মসলাজাত ফসল।

আরও খবর

Sponsered content