সম্পাদকীয়

গণরায়ের পর- গণতন্ত্রের দায়

  এটিএম রাকিবুল বাসার সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৪:৪৪:৩৭ প্রিন্ট সংস্করণ

এটিএম রাকিবুল বাসার ,                  সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।
এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের পুনঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, রক্তপাত ও গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই নিছক সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। বহু মানুষের আত্মত্যাগ, রাজপথের বিস্ফোরিত ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে জাতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: তারা আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতার প্রত্যাবর্তন চায় না।

কোটা সংস্কারের দাবি ঘিরে যে আন্দোলনের সূচনা, তা দ্রুত রূপ নেয় বৃহত্তর গণপ্রতিরোধে। শুরুতে সুস্পষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকলেও আন্দোলনটি একসময় শাসনব্যবস্থার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মানুষ কেবল একটি নীতির পরিবর্তন নয়, শাসনের ধরন বদলের দাবি জানায়। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই দেখা যায়, একটি প্রভাবশালী মহল সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদ থেকে ধর্মীয় উগ্রতার আবরণে আরেক ধরনের কর্তৃত্ববাদের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন স্থানে হামলা, উসকানি ও চাপ সৃষ্টির রাজনীতি উদ্বেগ বাড়ায়। এমনকি ক্ষমতার ভেতর থেকেও কোথাও কোথাও সেই উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ফলে মুক্তমনা ও গণতন্ত্রমনা মানুষের মধ্যে আশঙ্কা জন্ম নেয়—নতুন বিপদের সূচনা কি তবে? এই প্রেক্ষাপটে একটি নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে স্বস্তির কারণ হিসেবে দেখেছেন। নির্বাচিত সরকার থাকলে মতপার্থক্য সত্ত্বেও আলোচনার পথ খোলা থাকে; সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে সমাধানের সুযোগ থাকে।

নতুন সরকারের প্রতি আমাদের প্রধান প্রত্যাশা একটিই—গণতান্ত্রিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা। ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের দলীয়করণ কিংবা ধর্মীয় উগ্রতার রাজনীতি যেন আর মাথাচাড়া না দেয়। ঐকমত্য কমিশনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে; কোথাও কোথাও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে মৌলিক পরিবর্তন আনার চেষ্টার কথাও শোনা গেছে। নির্বাচনে একটি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেই সম্ভাবনাকে আপাতত স্তিমিত করেছে। তবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন স্থিতিশীলতার প্রতীক, তেমনি তা সতর্কতারও কারণ।

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে—দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন যেমন সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি তা অনাকাঙ্ক্ষিত সংশোধনের ঝুঁকিও বাড়ায়। অতীতে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল কিংবা রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিতে পরিবর্তন—সবই ঘটেছে এমন শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। তাই বর্তমান সংসদের কাছে আবেদন—এই শক্তিকে যেন ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়; আর যেখানে মতভেদ আছে, সেখানে খোলামেলা বিতর্কের পথ বেছে নেওয়া হোক—সংসদের ভেতরে ও বাইরে।

আরেকটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না—দুই প্রধান জোটের বাইরে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সক্রিয় বহু শক্তির প্রতিনিধিত্ব সংসদে সীমিত। অনেক ভোটার কৌশলগতভাবে একটি দলকে বিপুল সমর্থন দিয়েছেন, যাতে সংবিধানবিরোধী বা উগ্র রাজনীতির পাঁয়তারা রুখে দেওয়া যায়। অর্থাৎ এই বিজয়ের পেছনে কেবল দলীয় সমর্থন নয়, আরও বিস্তৃত গণতান্ত্রিক শক্তির আস্থা রয়েছে। সেই আস্থার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি।

আমরা চাই, মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলার সুযোগ পাক। সংসদ কার্যকর হোক; একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, শিক্ষাঙ্গন ও গণমাধ্যমে সংলাপের ক্ষেত্র উন্মুক্ত থাকুক। যারা সাম্প্রতিক আন্দোলনে পরাজিত শক্তি হিসেবে নির্বাচনের বাইরে থেকেছে, তারাও যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে চায়, তাদের জন্য পথ খোলা থাকা উচিত। তবে শর্ত একটাই—গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের রায়কে সম্মান করতে হবে।

রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার—হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাট—এসব অপরাধের বিচার হওয়া অপরিহার্য। বিচারহীনতা ভবিষ্যৎ অপরাধের পথ প্রশস্ত করে। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিসর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়াও সমাধান নয়। ফ্যাসিবাদী মানসিকতা ও উগ্র রাজনীতিকে পরাজিত করতে হবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে—ভোটের মাঠে, যুক্তির ময়দানে।

যেমন অতীতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সংসদে থেকেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য হয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্তদেরও আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনার পথে আসতে হবে। জাতীয় পুনর্মিলন প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়; সত্য স্বীকার ও জবাবদিহির মাধ্যমে সম্ভব।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গণতন্ত্র কি ব্যক্তিনির্ভর থাকবে, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে? অতীতে আমরা শুনেছি, শাসকরা সম্রাটের ভঙ্গিতে ঘোষণা দিয়েছেন—‘আমি দিলাম, আমি করলাম।’ এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা—এসব কোনো ব্যক্তির অনুগ্রহ নয়; এগুলো নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এমন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সরকার বদলালেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অটুট থাকে।

আমরা আর চাই না, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বারবার রাজপথে নামতে হোক, অর্থনীতি হরতাল-অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। আগামী দিনের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র হোক অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা কিংবা ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন যেন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সংকটে না পড়ে—এটাই জাতির প্রত্যাশা।

এত রক্তপাত ও ত্যাগের পর যে সরকার এসেছে, তার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বড়। তারা যদি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করতে পারে, তবে দেশ নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। আর যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা, ধর্মীয় উগ্রতা বা প্রতিহিংসার রাজনীতি ফিরে আসে, তবে সেই ত্যাগের মূল্যায়ন হবে না।

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করেছে। এখন সময় প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল নির্বাচন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক চর্চারও পরিবর্তন জরুরি। আমরা আশাবাদী—এই সংসদ ও সরকার সেই দায়িত্ব পালন করবে, এবং বাংলাদেশের যাত্রা আর পেছনে ফিরবে না।

লিখেছেন- এটিএম রাকিবুল বাসার
সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ

আরও খবর

Sponsered content