প্রতিনিধি ২৮ মার্চ ২০২৫ , ১০:৫০:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ
“মিতার নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে আমি তড়িঘড়ি করে তার বাড়িতে ছুটে যাই। তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে আমি সরাসরি নিকটস্থ থানায় যাই। আমরা তাকে সর্বত্র খুঁজেছি! অবশেষে, সাত (০৭) দিন পর তাকে খুঁজে পাই। মনে হলো যেন আমি আমার নিজের বোনকে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছি!”—বললেন নাঈম (২০), ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের যুব ফোরামের সহ-সভাপতি এবং গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাম্বাসেডর, লিগ্যাসি প্রজেক্ট, লন্ডন।
বাংলাদেশের মতো দেশে শিশু পাচার, বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করার প্রধান অভিশাপগুলোর মধ্যে অন্যতম। ওয়ার্ল্ড ভিশনের সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, মহামারির কারণে বাল্যবিবাহের হার ৪৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও, ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রম ২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে, আর ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫%। তদুপরি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ১০,০০০ শিশু পাচারের শিকার হয়।
এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান সত্ত্বেও, এখনো আশার আলো আছে, কারণ নাঈমের মতো অদৃশ্য নায়করা এসব সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি টঙ্গী এলাকার একটি যুব ফোরামের সহ-সভাপতি, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এরশাদ নগর, যেখানে তিনি কাজ করেন, এটি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত একটি ঘনবসতিপূর্ণ শিল্প এলাকা। তিনি ৮৭টি বাল্যবিবাহ রোধ করেছেন, যৌন হয়রানির শিকার চারজনকে সহায়তা করেছেন এবং তিনটি শিশু পাচারের ঘটনা রুখতে সাহায্য করেছেন। শিশু ধর্ষণের দুটি মামলায় অপরাধীদের জেলে পাঠানোর জন্য তিনি সরাসরি কাজ করেছেন।
তবে এই সাহস দেখানো মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলায় তিনি মা বাবাকে হারান এবং নানির কাছে একটি বস্তিতে বেড়ে ওঠেন। সঠিক যত্ন ও দিকনির্দেশনার অভাবে তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী এবং জনসমক্ষে কথা বলতে ভয় পেতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
“একদিন, আমি দেখি আমার বয়সী কিছু ছেলেমেয়ে একটি মিটিং করছে। তাদের আলোচনা আমাকে আকর্ষণ করে,” তিনি স্মরণ করেন। কৌতূহলী হয়ে তিনি জানতে চান এবং বুঝতে পারেন যে তারা একটি শিশু ফোরামের সদস্য। উত্তেজিত হয়ে তিনি তাদের সভায় অংশ নিতে শুরু করেন। “এর আগে আমি শিশুদের অধিকার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তবে ফোরামের সেশনে যোগ দেওয়ার পর আমি বুঝতে পারলাম, আমিও একজন শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের শিকার।”
নতুন উপলব্ধি থেকে তিনি নিজের কণ্ঠস্বর উঁচু করতে শুরু করেন। তিনি শিশু সুরক্ষা, শিশু অধিকার, শিশু সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। যে ছেলে একসময় জনসমক্ষে কথা বলতে লজ্জা পেত, সে-ই একসময় অন্যদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা শেখাতে শুরু করলেন। শিশু ও যুব ফোরামের কার্যক্রমের মাধ্যমে, তিনি ও তার বন্ধুরা ৩০টিরও বেশি স্কুল ও কলেজে ১,০০,০০০-এর বেশি অফলাইন ও অনলাইন প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক এবং গোলটেবিল আলোচনা পরিচালনা করেছেন। এসব কার্যক্রম শিশুদের সুরক্ষা আইন, বাল্যবিবাহ, শিশু পাচার, শিশুশ্রম ও শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে। তার কাজ শুধু তার নিজের পরিবার নয়, তার সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারকেও আলোকিত করেছে। আগে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েরা বাল্যবিবাহের শিকার হতো, কিন্তু সচেতনতামূলক প্রচারণা ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে এখন মানুষ অনেক বেশি সচেতন। এখন, যদি কোনো বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটতে চলেছে এবং তিনি জানতে পারেন, তবে অপরাধীরা প্রায়শই ভয়ে বিয়ে থামিয়ে দেয়।
“আগে আমি পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেতাম, কিন্তু এখন আমি নিজেই সংকটময় পরিস্থিতি সামলাচ্ছি। সময়ের সাথে আমি বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করেছি , মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও কাজ করছি। আজ আমি শিশু ও যুব অধিকার বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছি,” তিনি বলেন।
এযাবৎ নাঈম আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জায়গায় সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক পত্রিকা The Beacon, যা নাঈমকে “আন্তর্জাতিক হিরো” হিসেবে ভূষিত করেছে। এছাড়াও, ওয়ার্ল্ড ভিশন কানাডা ও বাংলাদেশ তাকে আন্তর্জাতিক হিরো হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা The Legacy Project-এর গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি, নাঈম এখন আন্তর্জাতিক শিশু ও যুব উন্নয়ন কর্মী ও অ্যাডভোকেট হিসেবে শিশু ও যুব অধিকার ও সুরক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন।
তিনি গ্যাংস্টার এবং অপরাধীদের কাছ থেকে হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু কিছুই তাকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “পরিবর্তন আনা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। কেউ যদি বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখে, তবে অনেক বাধা আসবেই। কিন্তু আমার একটি স্বপ্ন আছে—একটি নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশু আর সহিংসতার শিকার হবে না! মানুষ আমাকে উৎসাহিত করে, আর সেটাই আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।”




















