সম্পাদকীয়

প্রত্যাবর্তনের পর—কোন পথে রাষ্ট্রনায়ক?

  এটিএম রাকিবুল বাসার সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৯:৪১:৪৩ প্রিন্ট সংস্করণ

এটিএম রাকিবুল বাসার ,                  সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।
এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসনের অন্ধকার পেরিয়ে আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে প্রত্যাবর্তন করেছেন তারেক রহমান—এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এই প্রত্যাবর্তন নিছক ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি সময়, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের সঙ্গে এক ব্যক্তির সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ কি কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক সম্ভাব্য রূপান্তরের সূচনা?

রবার্ট ব্রাউনিংয়ের কবিতা The Patriot ক্ষমতার অনিত্যতা ও জনসমর্থনের ভঙ্গুরতার এক গভীর রূপক। কবিতার শুরুতে যে নায়ক ফুলবৃষ্টি আর উল্লাসের মধ্য দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করেন, শেষ দৃশ্যে তাকেই পাথর নিক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়। রাজনীতির বাস্তবতাও অনেক সময় এমন—জনতার আবেগ দ্রুত ওঠানামা করে; স্থায়ী হয় কেবল প্রতিষ্ঠান, নীতি ও উত্তরাধিকার।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সামনে কার্যত চারটি কৌশলগত পথ খোলা।

প্রথম পথ—সংস্কারকেন্দ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা।
এই পথে হাঁটতে হলে প্রশাসনিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, দলীয় প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণ—এসব প্রশ্নে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। বক্তৃতায় সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া সহজ; কিন্তু দলীয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া কঠিন। তবু দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য এই পথই সবচেয়ে কার্যকর।

দ্বিতীয় পথ—পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর পুনরুৎপাদন।
দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনের কেন্দ্রীকরণ, প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ—দক্ষিণ এশিয়ায় এটি পরিচিত মডেল। স্বল্পমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈধতার সংকট তৈরি হয়।

তৃতীয় পথ—প্রতিশোধমূলক রাজনীতি।
দীর্ঘ মামলা ও নির্যাতনের ইতিহাস একজন নেতাকে প্রতিপক্ষ দমনে প্রলুব্ধ করতে পারে। এতে সমর্থকদের আবেগ উসকে ওঠে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরে মেরুকরণ বাড়ে, অর্থনীতি অস্থির হয় এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

চতুর্থ পথ—নীতিনিরপেক্ষ স্থবিরতা।
ভুলের আশঙ্কায় বড় সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়া। এতে সরকার টিকে থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র এগোয় না। এটি স্থিতিশীল অথচ নিষ্ক্রিয় শাসনের রূপ দেয়।

এই চার পথের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রশ্নে তিনটি বিষয় নির্ণায়ক হবে—দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের মাত্রা এবং জনসমর্থন ব্যবস্থাপনার কৌশল।

তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে একটি নতুন শব্দভাণ্ডার লক্ষণীয়—নিরাপত্তা, পরিকল্পনা, বিকেন্দ্রীকরণ, অংশগ্রহণ, নারী, তরুণ, প্রবাসী, কৃষক। এটি ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। অতীতের বিতর্কিত ইমেজ কাটাতে ভবিষ্যতমুখী ভাষা অপরিহার্য। তবে রাজনৈতিক ভাষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে প্রতিফলিত হয়। কেবল দুঃখ প্রকাশ বা সমঝোতার আহ্বান নয়—প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগনীতি, আইনপ্রয়োগ—এসব ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন ঘটতে হবে।

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতা হলো দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা অস্পষ্ট থাকা। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারেক রহমান কি এই সীমারেখা স্পষ্ট করতে পারবেন—এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে তার নেতৃত্বের চরিত্র।

নির্বাচনের পর তার আচরণে কিছু ইতিবাচক বার্তা এসেছে। পরাজিত প্রার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, প্রকাশ্যে সৌহার্দ প্রদর্শন—এগুলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল। পরাজয়কে শত্রুতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া একটি পরিণত মনোভাবের লক্ষণ। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে সংঘাতের বদলে সহাবস্থান, প্রতিশোধের বদলে সমঝোতার সংস্কৃতি শক্তিশালী হতে পারে।

তার সামনে সুযোগ রয়েছে নিজেকে কেবল উত্তরাধিকারী নয়, বরং রূপান্তরের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। এর জন্য প্রয়োজন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার ও প্রশাসনের কার্যকর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং নীতিনির্ধারণে দলীয় প্রভাব কমানো।

এখানেই ব্রাউনিংয়ের The Patriot নতুন অর্থে ফিরে আসে। কবিতার নায়ক শেষ পর্যন্ত জনতার উল্লাসে নয়, নৈতিক বিচারে টিকে থাকেন। রাজনীতিতেও জনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার। বক্তৃতা নয়, প্রতিষ্ঠান নির্মাণই শেষ কথা বলে।

প্রশ্নটি তাই নৈতিকতার চেয়ে কৌশলের—তিনি কি ক্ষমতার সুবিধাভোগী হয়ে থাকবেন, নাকি ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে উদ্যোগী হবেন? দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, দ্বিতীয় পথ কঠিন। ক্ষমতা প্রায়শই সমালোচনাকে দূরে সরিয়ে দেয়, ভুলকে যুক্তিতে রূপ দেয়। তবু ব্যতিক্রমের সম্ভাবনা সবসময় থাকে। দীর্ঘ নির্বাসনের অভিজ্ঞতা যদি তাকে ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়ে থাকে, তবে সেটিই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূলধন।

আজ তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের দলিল হয়ে থাকবে। ইতিহাস তাকে বিচার করবে বক্তৃতায় নয়, বরং নীতি বাস্তবায়নে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণে এবং ক্ষমতার সংযত ব্যবহারে।

যদি উদারতা ও সংযমের এই সুর অব্যাহত থাকে, তবে তার রাজনৈতিক বিদায় কোনো কাব্যিক ট্র্যাজেডি হবে না। বরং তা হতে পারে একটি পরিণত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অধ্যায়—যেখানে ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র ও নীতির উত্তরাধিকার স্থায়ী।

লিখেছেন – এটিএম রাকিবুল বাসার
সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ

আরও খবর

Sponsered content