২০১৬ সালে ই-কমার্সের আড়ালে বৈধ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করেছিল নোভেরা প্রোডাক্টস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি। এর মালিকই অতিথি ডটকমের বর্তমান সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতারক সাইফুল ইসলাম সোহেল। বিনিয়োগ নেওয়ার নামে যিনি ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকা।
শুরুতে বিনিয়োগে আগ্রহীদের বিভিন্ন ধরনের লোভ দেখিয়ে বলা হতো, নোভেরা ই-কমার্স বা সরাসরি মার্কেটিংয়ের প্রতিষ্ঠান। এখানে বিনিয়োগ করলে প্রোডাক্টস, কমিশন ও মাসিক বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা প্রায় তিন বছর আগে বিনিয়োগ করেও কোনো টাকা বা কমিশন ফেরত পাননি। উল্টো টাকা চাইতে গেলে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাদের বের করে দেওয়া হতো।
বরিশাল বানাড়িপাড়ার বাসিন্দা এফ আই মানিক জানান, ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নোভেরা প্রোডাক্টস লিমিটেডের ডিওএইচএস’র অফিসে বসে ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন।
মানিক ছাড়াও মো. মনির হোসেন ৯ লাখ ৫০ হাজার, মো. ইয়াকুব ইসলাম সুমন ১১ লাখ, মো. জাহিদ মিয়া ৭ লাখ, মো. সম্রাট রেজা রবিন ৬ লাখ, মো. শাহিন ৭ লাখ, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ৪ লাখ, ইফতেখার আহম্মেদ সুমন ১০ লাখ, আসাদুজ্জামান আসাদ ৬ লাখ, মো. সিফাতুল্লাহ সালেহী সাড়ে ৩ লাখ, মো. তাজুল ইসলাম ১২ লাখ, হামিম আহসান ২ লাখ, মো. শহিদুল ইসলাম লাইস ২ লাখ, মো. রাজু আহম্মেদ ২ লাখ টাকাসহ আরও অনেকে বিনিয়োগ করেছিলেন।
ভুক্তভোগী কামরুল বলেন, ‘এই প্রতারণা নিয়ে পল্লবী থানায় মামলা হওয়ার পর ২০১৯ সালে সাইফুল ইসলাম সোহেল গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পরই আইনের ফাঁক- ফোঁকর দিয়ে বের হয়ে যান। কিন্তু ১০ বছর অতিবাহিত হলেও আজও আমরা আমাদের এক টাকাও ফেরত পাইনি। উল্টো সোহেল এখন ধরা ছোঁয়ার বাইরে, এখন তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। তার অফিসে চাকরি করেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব, ডিআইজি, ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেলসহ অনেক বড় মাপের লোকজন। তাই এখন তার খুঁটির জোর অনেক।’
তবে তিনি যেকোনো মুহূর্তে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন।কারণ, ইতোমধ্যেই বর্তমান বিনিয়োগকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছেন।এ ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগও করছেন, যোগ করেন কামরুল।
পুলিশ প্লাজার সমনে দেখা মেলে এমনি কয়েক ভুক্তভোগীর। টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয় এই ভয়ে তারা নাম প্রকাশে নারাজ। তবে জানান, বর্তমানে নোভেরার ভুক্তভোগীরা যখন সাইফুলের নতুন অফিস ‘অতিথি ডট কম’-এ গিয়ে পাওনা টাকা দাবি করেন, তখন তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করা হয়। অনেককে হুমকি দেওয়া হয় এই বলে যে, ‘পুরনো কথা ভুলে যাও, নতুন কোম্পানিতে লোক ঢোকাও, তবেই টাকা তুলতে পারবে।’ অর্থাৎ নিজের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আরও ১০ জন মানুষের টাকা মারার ব্যবস্থা করতে বলা হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কয়েক দফা চেষ্টা করেও সাইফুলের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা আছে যে, বাংলাদেশে সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো ধরনের এমএলএম ব্যবসা করা যাবে না। বিশেষ করে যেখানে সদস্য অন্তর্ভুক্তিই আয়ের প্রধান উৎস, সেটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
‘অতিথি ডট কম’ বুকিং সেবার আড়ালে যা করছে তা শতভাগ এমএলএম। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ হাজার এজেন্ট তৈরি করেছে। যদি মাথাপিছু গড়ে ১০ হাজার টাকাও নেওয়া হয়ে থাকে, তবে এর অঙ্ক দাঁড়ায় ৫০০ কোটি টাকারও বেশি।
এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অতিথি ডট কমের প্রতারণা সম্পর্কে আমি এইমাত্র অবহিত হলাম। ২০১৫ সালের পর বাংলাদেশে কোনো এমএলএম কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাই আইন অনুযায়ী, বর্তমানে কোনো বৈধ এমএলএম কোম্পানির অস্তিত্ব নেই।’
মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘যেহেতু অতিথি ডট কম পর্দার আড়ালে নিষিদ্ধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করছে, বিষয়টি আমি দ্রুত মন্ত্রীকে অবহিত করব এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সমাজবিজ্ঞানী ড. রেজা তৌফিক বারির মতে, বাংলাদেশের বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি মানুষকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের নেশায় অন্ধ করে দেয়। সাইফুলদের মতো প্রতারকরা জানে কীভাবে মানুষের এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে হয়। তারা মানুষকে স্বপ্ন দেখায় ‘আপনি ঘুমালেও আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হবে।’ এই ‘প্যাসিভ ইনকাম’-এর ধারণাটি যখন একজন বেকার যুবকের কানে পৌঁছায়, তখন সে তার শেষ সম্বলটুকু বা পরিবারের জমি বিক্রি করে এখানে বিনিয়োগ করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অর্গানাইজড ক্রাইম টিম সূত্রে জানা গেছে, সাইফুলের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে তারা তথ্য সংগ্রহ করছেন। এর আগে নোভেরা প্রোডাক্টসের সময় সাইফুলের ব্যবহৃত গাড়ি ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছিল, কিন্তু যথাযথ আইনি তদারকির অভাবে তিনি আবার মুক্ত হয়ে একই কাজ শুরু করেছেন।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখনই ‘অতিথি ডট কম’-এর এই বিশাল জাল গুড়িয়ে দেওয়া না হয়, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ধস নামাবে বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ। ডেসটিনির সময় মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছিল, নতুন এই ‘অতিথি ডটকম’-এর ছোবলে আবারও একই পরিণতি হবে আমানতকারীদের।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।