যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী ঢালাওভাবে আরোপ করা শুল্ক বা গ্লোবাল ট্যারিফ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়কে ‘ভয়াবহ’ অভিহিত করে বাতিল হয়ে যাওয়া শুল্কের বদলে নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প ‘সেকশন ১২২’ নামে আগে কখনো ব্যবহৃত না হওয়া একটি আইনের আওতায় নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এ আইন অনুযায়ী, কংগ্রেস হস্তক্ষেপ করার আগে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যায়। এটি আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিচারকরা গত বছর হোয়াইট হাউসে ঘোষিত তার বৈশ্বিক শুল্কের বেশিরভাগকে বেআইনি ঘোষণা করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট অন্য আইনের বলে তার নতুন শুল্ক পরিকল্পনা উন্মোচন করেন।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ৬-৩ ভোটে দেওয়া রায়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ১৯৭৭ সালের ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রয়োগ করতে গিয়ে তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
তাদের এই সিদ্ধান্ত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যেসব মার্কিন রাজ্য ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, তাদের জন্য বড় জয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইইইপিএ-র বদৌলতে কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্র যাদের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছে, তা ফেরত দেওয়ার পথ খুলবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন অনিশ্চয়তাও শুরু হবে।
তবে আইনি লড়াই ছাড়া শুল্কের মাধ্যমে নেওয়া অর্থ ফেরত যাবে না বলে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর এ আইনি লড়াই শেষ হতে কয়েক বছরও লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প জানান, শুল্ক কার্যকরে তার হাতে আরও অনেক আইন আছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে এই শুল্কের প্রয়োজন আছে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসসহ সুপ্রিম কোর্টের যে ছয়জন বিচারক ট্রাম্পের শুল্কের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তার মধ্যে তিন উদারপন্থীর পাশাপাশি ট্রাম্পের হাতে নিয়োগ পাওয়া দুই বিচারক অ্যামি কনে ব্যারেট ও নেইল গোরসাচও আছেন। তবে তিন রক্ষণশীল বিচারক ক্লারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানহ ও স্যামুয়েল আলিতো সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, রিপাবলিকানদের হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত যে বিচারকরা তার শুল্ক নীতির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাদের নিয়ে তিনি ‘ভীষণ লজ্জিত’। ওই বিচারকরা ‘বোকা ও তোষামোদে লিপ্ত’ এবং তাদের ‘দেশপ্রেম একেবারেই নেই এবং তারা সংবিধানের প্রতিও অনুগত নয়’, বলেছেন তিনি।
ট্রাম্পের আদেশে কিছু খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সার, কমলা ও গরুর মাংসের মতো কিছু কৃষিজাত পণ্য, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক্স এবং নির্দিষ্ট কিছু গাড়িসহ অনেক পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ছাড়ের তালিকা খুবই সাধারণভাবে দেওয়া হয়েছে-ঠিক কোন কোন পণ্য এই ছাড় পাবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) অধীনে কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্যই ছাড়ের আওতাতেই থাকবে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাজ্য, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে তাদেরকেও এখন ধারা ১২২ এর অধীনে ১০ শতাংশ শুল্ক দেওয়া লাগবে। আলোচনার মাধ্যমে আগে যে শুল্কে চুক্তি সম্পাদনকারী পক্ষগুলো একমত হয়েছিল, তা বাতিল হয়ে যাবে।
এরপরও দেশগুলো বাণিজ্য চুক্তির আওতায় মার্কিন পণ্যগুলোকে যে ছাড় দিয়েছিল তা অব্যাহত রাখবে বলেই ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, বলেছেন ওই কর্মকর্তা।
ধারা ১২২ এর পাশাপাশি ধারা ২৩২ ও ধারা ৩০১সহ আরও কিছু আইনেও ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অন্যায্য বাণিজ্য চর্চার যুক্তি দিয়ে বিভিন্ন দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করতে পারেন। হোয়াইট হাউস সেসব আইনও বিবেচনা করছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
এর মধ্যে কিছু আইন ট্রাম্প আগে ব্যবহারও করেছেন। গত বছর তিনি ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির মতো খাতগুলোতে আইইইপিএ-র বাইরের আইনেই শুল্ক বসিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য সেসব শুল্কে হাত দেয়নি।
‘পরিস্থিতি আজ আরও জটিল, আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল,’ বলেছেন ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো জেফরি গার্টজ।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।