
আরেকটি বছর শেষ হচ্ছে। হিসাবের খাতায় যেমন ব্যক্তিজীবনের লাভ–ক্ষতির হিসাব মেলে, তেমনি জাতির ক্রীড়াজীবনও দাঁড়িয়ে পড়ে মূল্যায়নের কাঠগড়ায়। সদ্যসমাপ্ত বছরটি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ছিল না সাফল্যের ঝলকানিতে ভরা, আবার পুরোপুরি ব্যর্থতায় ডুবে যাওয়া এক বছরও নয়। বরং এটি ছিল সম্ভাবনা আর সীমাবদ্ধতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক রূপান্তরকাল।
ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা হকিতে বড় কোনো আন্তর্জাতিক সাফল্য না এলেও খেলাধুলা একেবারে স্থবির ছিল না। বিশেষ করে নারী ফুটবলারদের এএফসি মহিলা এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ছিল এক উজ্জ্বল প্রাপ্তি। এটি প্রমাণ করে—সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক সমর্থন পেলে সীমিত সম্পদেও সাফল্য সম্ভব।
অন্যদিকে পুরুষ ফুটবলে সাফল্য হাতছাড়া হলেও নতুন আশার নাম হামজা চৌধুরী। ইংল্যান্ড লিগে খেলা এই ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি দেশের ফুটবলে নতুন উন্মাদনা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় নিমজ্জিত ফুটবলে প্রবাসী খেলোয়াড়দের আগমন নতুন গতি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। তবে এই উচ্ছ্বাসকে স্থায়ী রূপ দিতে না পারলে তা আরেকটি অপচয় হওয়া সম্ভাবনাতেই পরিণত হবে।
ক্রিকেটে বছরটি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি বিতর্কের। প্রশাসনিক অস্থিরতা, বিসিবির নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং মাঠের বাইরের নানা ইস্যু ক্রিকেটের ইতিবাচক চর্চাকে অনেকটাই আড়াল করে দেয়। মাঠের পারফরম্যান্সেও তার ছাপ স্পষ্ট। টেস্ট ক্রিকেটে কিছু সাফল্য এলেও ওয়ানডে ফরম্যাটে বাংলাদেশের অবনতিশীল পারফরম্যান্স গভীর উদ্বেগের কারণ। একসময়ের শক্তিশালী ফরম্যাটে আজ বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে আফগানিস্তান ও শ্রীলংকার মতো দলের তুলনায়। নেতৃত্ব সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এর বড় কারণ।
নারী ক্রিকেটেও প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ফলাফলে উন্নতির ঘাটতি স্পষ্ট। তবে নারীদের ক্রীড়ায় সমস্যা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। নারী ফুটবলারদের বিদ্রোহ এবং নারী ক্রিকেটারদের হয়রানির অভিযোগ প্রমাণ করে—নারী ক্রীড়াঙ্গনে এখনও নিরাপদ ও পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।
ফুটবলের ঘরোয়া পর্যায়ে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের দীর্ঘ ২৩ বছর পর শিরোপা জয় একটি আবেগঘন বার্তা বহন করে। এটি দেখিয়ে দেয়, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে ঐতিহ্যও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে এটি দেশের অন্যান্য ক্লাবের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত।
অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, শুটিং কিংবা দাবার মতো ডিসিপ্লিনে বড় সাফল্য না এলেও আর্চারিতে আব্দুর রহমান আলিফের সোনাজয় এবং নারী কাবাডিতে ব্রোঞ্জ পদক দেখিয়ে দেয়—সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সম্ভাবনার অভাব নেই।
সব মিলিয়ে বছরটি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এক সতর্কবার্তা। উচ্ছ্বাসের মুহূর্তগুলো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই উচ্ছ্বাসকে কাঠামোগত উন্নয়নে রূপ দেওয়া। প্রবাসী খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি যেমন জরুরি, তেমনি তৃণমূল ক্রীড়াকে অবহেলা করলে ভবিষ্যৎ শূন্য হয়ে পড়বে।
এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পেশাদার প্রশাসন এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এনএসসি ও সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনগুলোর উচিত কেবল সাফল্যের ছবি তোলা নয়, বরং ব্যর্থতার দায় নেওয়ার সাহস দেখানো। তাহলেই কেবল বছরের শেষ সূর্যাস্তের পর নতুন বছরের সূর্যোদয় সত্যিকারের আলো ছড়াতে পারবে।
এটিএম রাকিবুল বাসার , ক্রীড়া বিশ্লেষক ও সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।