
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের একটি দুর্দান্ত সমঝোতা করেছি।’ ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
তবে ট্রাম্পের এ দাবির পরপরই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, চুক্তি নিয়ে প্রকাশিত খবরগুলো ‘জল্পনাকল্পনা’ মাত্র এবং ‘এখনও কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।’
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো নিশ্চিত করা যে ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। তিনি জানান, চুক্তির নথিপত্র প্রায় চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে এবং ‘খুব দ্রুত’ তা স্বাক্ষরিত হতে পারে। ইউরোপে কোনো এক স্থানে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানেরও ইঙ্গিত দেন তিনি।
এছাড়া ট্রাম্প দাবি করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত হবে। বর্তমানে ইরান কার্যত এই জলপথ বন্ধ করে রেখেছে, যা বিশ্ববাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট।
ট্রাম্প জানান, তিনি অঞ্চলটির বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন, যার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও রয়েছেন। তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইসরায়েল প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয়।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এমন একটি চূড়ান্ত চুক্তিকে সমর্থন করবে যাতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইরানের মুখপাত্র বাঘেই জানান, সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশ অংশ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে ‘অতিরিক্ত দাবি’ এবং ‘নতুন শর্ত’ যোগ করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান তার ‘লাল রেখা’ থেকে সরে আসবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়।
এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত থাকে। চলতি সপ্তাহেও দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে চুক্তির আশাবাদী মন্তব্য করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘আজ রাতে ইরানকে খুব কঠোরভাবে আঘাত করবে।’ তিনি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপসহ বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো দখলেরও হুমকি দেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে জানায়, নতুন কোনো হামলা হলে তাদের জবাব হবে ‘আগের চেয়েও কঠোর’। ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ‘ভুল কৌশল অঞ্চলটিকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।’
সোমবার উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। বুধবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দক্ষিণ ইরানের সামরিক, নজরদারি ও রাডার স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর কথা জানায়।
জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে। বাহরাইনে একটি ড্রোন হামলায় ১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু আহত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সংঘাতের সাম্প্রতিক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
এছাড়া পাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারত এবং সৌদি আরবও দ্রুত উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।