জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ পরস্পরের ‘অল্টার ইগো’ , অর্থাৎ তারা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ টিকে থাকলে জামায়াতও থাকবে, আর জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগও থাকবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সাড়ে ১৪ মিনিটের এ সাক্ষাৎকার সংবাদমাধ্যমটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার করা হয়। এ সময় তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংস্কারের অগ্রগতি, নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কথা বলেন।
জুলাই অভ্যুত্থান সংগঠকদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেননি মাহফুজ আলম। নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছেন না। এর কারণ জানতে চাইলে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আমার মনে হয়েছে, কোনো দলের হয়ে নির্বাচন করার সঠিক সময় এটি নয়।আমি আশা করেছিলাম জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণ শক্তিগুলোকে এক করে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ বা থার্ড অল্টারনেটিভ গড়ে উঠবে। এনসিপি যখন পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা ‘ওল্ড পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’-এর অংশ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন সেই ‘তৃতীয় শক্তি’ গড়ার স্বপ্ন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
তার মতে, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার জোটটি কোনো সঠিক বোঝাপড়া ছাড়াই গঠিত হয়েছে। আদর্শিক জায়গা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি—সব দিক থেকেই জামায়াতের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন সম্ভব নয়।
মাহফুজ আলম বলেন, যাদের সঙ্গে জোট করা হয়েছে, তারা পুরনো কাঠামোরই অংশ। জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এমন অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, যার কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই। কারণ, বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের স্বচ্ছ কোনো ভিশন বা পরিকল্পনা নেই।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত দেড় বছরের যাত্রা ছিল এক ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র মধ্য দিয়ে যাওয়া। যেখানে পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা ‘ওল্ড পলিটিক্যাল সিস্টেম’ নতুন মোড়কে আবার ফিরে এসেছে, যা জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক করে মাহফুজ আলম বলেন, ক্ষমতায় যে দলই আসুক— বিএনপি বা জামায়াত, সমাজের ভেতরে থাকা ক্ষত সারাতে না পারলে কোনো সরকারই টিকবে না। তিনি বলেন, ‘শুধু কাগজে-কলমে সংস্কার করলেই হবে না। সমাজে যদি ভিন্নমত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমঝোতা বা ‘রিনেগোসিয়েশন’ না হয়, তবে সমাজে মব ভায়োলেন্স বা বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।
সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, মানুষের মধ্যে গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমেছে; সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে গণমাধ্যমকে তাদের অতীত ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনার জায়গায় আসতে হবে।
র্তমানে রাজনীতির বাইরে থাকা মাহফুজ আলম বই পড়া ও হতাশ তরুণদের সঙ্গে আলাপে সময় দিচ্ছেন বলে জানান। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতিগুলো কেন বাস্তবায়িত হয়নি এবং সামনে কীভাবে এগোনো উচিত।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ২৮ আগস্ট মাহফুজ আলম প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হন এবং ১০ নভেম্বর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।