
২০১৫ সালে চুরুলিয়া সফরে গিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাড়ির বিপরীতে একটি দেয়ালে খোদাই করা বাক্য আমার চোখে পড়ে। বাক্যটির সারমর্ম ছিল—নজরুলের জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হলো, তিনি কখনো মদিনায় গিয়ে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারকে দোয়া করতে পারেননি।
এই আক্ষেপের ভেতর দিয়েই স্পষ্ট হয়, নজরুলের হৃদয়ের গভীরে ইসলামের প্রতি অনুরাগ কতটা প্রবল ছিল। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ” উচ্চারণ হয়তো এক রাজনৈতিক বীরত্বের কোড, যেটিকে প্রীতি কুমার মিত্র ‘উল্লম্ব ব্যক্তিত্ববাদ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিদ্রোহী সত্তার বাইরে নজরুলের আধ্যাত্মিক চেতনা যে আরও শক্তিশালী, তা তাঁর কবিতা ও জীবনপাঠের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত।
নজরুল শৈশব থেকেই কোরআন শিক্ষায় সমৃদ্ধ ছিলেন। তাঁর অসাধারণ কোরআনপাঠ শুনে অনেক আলেম মুগ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে একাধিক কবিতা ও গান রচনা করেন।
‘বনগীতি’ দ্বিতীয় খণ্ডে মুহাম্মদ (সা.)-কে নিবেদিত আটটি কবিতা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটি—‘আবির্ভাব’ ও ‘তিরোভাব’—নবীজির জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে। অন্য কবিতাগুলোতেও নবীপ্রেম ছড়িয়ে আছে। যেমন,
“হে মদিনার বুলবুলি গো…”
“দীন দরিদ্র কাঙালের তরে এই দুনিয়ায় আসি…”
“পাঠাও বেহেশত হতে, হজরত পুনঃ সাম্যের বাণী…”
এসব কবিতায় নবীকে তিনি দরিদ্রের বন্ধু, শ্রমিক-কৃষকের রক্ষক এবং সাম্যের অগ্রদূত হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
১৯৩৩ সালে নজরুল ‘কাব্য আমপারা’ নামে কোরআনের ৩৮টি সূরার অনুবাদ প্রকাশ করেন। যদিও আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর বিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদ (১৯৩৪) তখনও প্রকাশিত হয়নি, তবু নজরুলের অনুবাদ কোরআন-প্রশিক্ষিত তাঁর মননেরই স্বতঃস্ফূর্ত ফসল।
কোরআনের অসংখ্য আয়াতে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মর্যাদা ও দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে। নজরুল সেই চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই নবীপ্রেমকে নিজের কবিতায় ধারণ করেছেন।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যে বীরত্ববাদী কোড তিনি রাজনৈতিক অর্থে নির্মাণ করেছিলেন, তা ক্রমে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনায় নবীপ্রেমে রূপ নেয়। সন্তানের অকালমৃত্যু ও ব্যক্তিজীবনের দুঃখকষ্ট তাঁকে আরও আধ্যাত্মিক করে তোলে। নবী মুহাম্মদ (সা.) হয়ে ওঠেন তাঁর নতুন নায়ক, চিরমুশকিল আসান।
‘বনগীতি’র একটি গানে তিনি লিখেছেন—
“মোহাম্মদ নাম যতই জপি, ততই মধুর লাগে,
নামে এত মধু থাকে, কে জানিত আগে।”
নজরুলের নবীপ্রেম শুধু মানবজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি কল্পনা করেছেন, পশুপাখিও সেই নাম জপ করছে।
রাজনৈতিক বিদ্রোহ থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক অন্বেষণ—কবি নজরুলের জীবন এক পরিপূর্ণ যাত্রা। বিদ্রোহী সত্তার মধ্যেও তাঁর অন্তর্লীন নবীপ্রেম চিরকালীন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
তাঁর ৪৯তম প্রয়াণ দিবসে কবিকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।