
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তার একটি শাখা নদী। দৈর্ঘ্যে মাত্র ১২০ ফুটের এই নদীই বছরের পর বছর ধরে দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর ওপর নির্মিত একটি নড়বড়ে কাঠের সাঁকোই বর্তমানে তাদের একমাত্র ভরসা।
প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো পারাপার করেন। সামান্য অসাবধানতাই ঘটাতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। বিশেষ করে বর্ষাকালে সাঁকোটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নদী পারাপারের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। বর্ষা মৌসুমে স্রোত বেড়ে গেলে অনেক সময় নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে যেত। ফলে দুই পাড়ের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও রোগীরা।
এই দুর্ভোগ লাঘবে ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ নিজ উদ্যোগে প্রায় ১২০ ফুট দীর্ঘ একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ ও স্থানীয় সহযোগিতায় কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও এটি এখনও একটি অস্থায়ী কাঠামো হিসেবেই রয়ে গেছে।
২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সাঁকোটি সম্পূর্ণ ভেঙে গেলে কয়েক মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে নতুন করে সাঁকো নির্মাণ করা হলেও প্রতিবছর বন্যা, ভাঙন ও কচুরিপানার চাপে এর অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ভেসে আসা কচুরিপানা সাঁকোর নিচে জমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করায় সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ বেঁকে গেছে এবং দেবে গেছে। কোথাও কাঠ পচে গেছে, কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্কুলছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষাকালে ভয় আরও বেড়ে যায়। একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেক কমে যাবে।”
কৃষক আমজাদ আলী বলেন, “ফসল উৎপাদন করলেও সহজে বাজারে নিতে পারি না। ভালো সেতু হলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেত এবং এলাকার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতো।”
পল্লী চিকিৎসক শিহাব মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, “জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে অনেক সময় নষ্ট হয়। স্থায়ী সেতু হলে স্বাস্থ্যসেবা অনেক সহজ হবে।”
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম খলিলুল্যাহ বলেন, “২০১৭ সাল থেকে নিজ উদ্যোগে এবং ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দে সাঁকোটি সংস্কার করে আসছি। কিন্তু কাঠের সাঁকো দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি স্থায়ী সেতুর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।”
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী জানান, ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও একটি সেতুর অভাবে হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।