ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা ঢাকা মহাদেবপুর–পত্মীতলা সড়ক ধরে ধীরে এগোচ্ছিল একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যান। ভ্যানে বসে থাকা পাঁচজন আদিবাসী কৃষক নিজেদের জমিতে ফলানো হলুদ বিক্রি করতে মহাদেবপুর হাটের পথে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভোরটাই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের শেষ ভোর।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শিবপুর পাটকাঠি এলাকায় দ্রুতগতির একটি ডাম্পট্রাক ভ্যানটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই চারজন মারা যান। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন বীরেন পাহান (৩৫), উজ্জল পাহান (৩৮), বিপুল পাহান (২৫), সঞ্জু উড়াও (৪৫) ও বিপ্লব পাহান (২২)। তারা সবাই এনায়েতপুর ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামের বাসিন্দা।
নূরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক উঠোনে শোকের কান্না। বীরেন পাহানের স্ত্রী বলেন, “হলুদ বিক্রি করে ফিরে আসার কথা ছিল। দুপুরে ভাত খাব—এই কথা বলে বের হয়েছিল।” সঞ্জু উড়াওয়ের পরিবার জানায়, তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি; তার মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডাম্পট্রাকটি ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির। সংঘর্ষে ভ্যানটি সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে থাকে হলুদের বস্তা—যেগুলো বিক্রি হলে কয়েক হাজার টাকা পাওয়া যেত। সেই হলুদই ছিল পরিবারগুলোর পুরো মৌসুমের ভরসা।
মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর স্বজনরা একে একে মৃত্যুসংবাদ পান। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, “চারজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। একজনকে রেফার্ড করা হলেও বাঁচানো যায়নি।”
দুর্ঘটনার পর ঘাতক ডাম্পট্রাকটি সড়কের পাশের একটি খালে পাওয়া গেলেও চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করেছে; মামলা প্রক্রিয়াধীন।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ভোরের সময় এই সড়কে ভারী যানবাহন দ্রুতগতিতে চললেও কার্যকর নজরদারি নেই। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এটা শুধু দুর্ঘটনা নয়—এটা অবহেলা। গরিব মানুষগুলোই বারবার মারা যায়।”
শনিবার মহাদেবপুর হাটে নিহতদের কেউই পৌঁছাতে পারেননি। তাদের হলুদ বিক্রি হয়নি। বাজারের সেই জায়গা ফাঁকা ছিল—আর নূরপুর গ্রামে পড়ে রইল পাঁচটি পরিবারের স্বপ্নের শেষ ঠিকানা।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।