চিত্রনায়ক, পরিচালক, প্রযোজক- বহু পরিচয়ে পরিচিত তিনি। তবে সব পরিচয় ছাপিয়ে দর্শকের হৃদয়ে তিনি ছিলেন ‘মিয়া ভাই’। বলছি, বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নায়ক ফারুকের কথা। সাদাকালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন পর্দা- দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থেকে হয়ে উঠেছিলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল অভিনেতা।
আজ ফারুকবিহীন চতুর্থ জন্মদিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ফিরে এসেছে ঠিকই কিন্তু প্রিয় এই অভিনেতাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ আর নেই! ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট জন্ম নেওয়া ফারুক ২০২৩ সালের ১৫ মে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দীর্ঘ আট বছর সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানেন। শরীরি উপস্থিতি নেই, কিন্তু স্মৃতির দেয়ালে, দর্শকের ভালোবাসায় আর অগণিত সিনেমার দৃশ্যে এখনো বেঁচে আছেন ‘মিয়া ভাই’।
অভিনেতার স্ত্রী ফারহানা পাঠান বলেন, ‘ফারুক পাশে নেই এখনো মানতে খুব কষ্ট হয়। তার স্মৃতি আগলে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেব। আজ পরিবারের সবাই কবর জিয়ারত করব। দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।’
জন্মদিন এলেই সাধারণত কেক কাটা, শুভেচ্ছা আর উৎসবের আয়োজন থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ফারুক ছিলেন ব্যতিক্রম। জন্মদিনে কেক কাটতে পছন্দ করতেন না তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কেক কাটা থেকে বিরত ছিলেন এই নায়ক। জন্মদিনকে ঘিরে তার এই ভিন্নধর্মী অভ্যাসও তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল বলেও জানান তার সহধর্মিণী ।
ফারুক শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। প্রযোজনা ও ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতিতেও তার ছিল দীর্ঘ পথচলা। ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আমৃত্যু দলটির রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সিনেমায় ফারুকের পথচলা শুরু হয় এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে। অভিষেকের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় ও দর্শকনন্দিত সিনেমায়। তার অভিনীত চরিত্রগুলো কখনো প্রেমিক, কখনো সংগ্রামী যুবক, কখনোবা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
তবে ‘মিয়া ভাই’ সিনেমার সাফল্যের পরই তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায় ‘মিয়া ভাই’ তকমাটি। পর্দার সেই চরিত্র যেন ধীরে ধীরে বাস্তবের ফারুকেরও পরিচয় হয়ে ওঠে। সহকর্মী থেকে শুরু করে সিনেমার দর্শক- সবাই ভালোবেসে তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘মিয়া ভাই’ নামে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ফারুক উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। শুধু একজন নায়ক হিসেবে নয়, বাংলা সিনেমার একটি সময়, একটি প্রজন্ম ও একটি আবেগের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে।
জীবনের শেষ দিকে দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে পর্দা থেকে দূরে ছিলেন ফারুক। কিন্তু তারকা হিসেবে তার জনপ্রিয়তায় কখনো ভাটা পড়েনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, দর্শকের কাছে তার পুরোনো সিনেমা ও চরিত্রগুলো ততই ফিরে এসেছে নতুন করে।
জন্মদিনে ফারুক না থাকলেও ভক্তদের স্মৃতিতে আজও অমলিন সেই হাসিমাখা মুখ, সেই স্বতন্ত্র অভিনয় আর ভালোবাসার ‘মিয়া ভাই’ ডাক। ফারুক নেই, তবে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তার নাম আছে, দর্শকের ভালোবাসায় তার জায়গা আছে। আর সেখানেই হয়তো একজন শিল্পীর বেঁচে থাকা।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।