প্রথমার্ধ শেষে হিউস্টনের স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের ফুটবলারদের মুখে ছিল হতাশার ছাপ। স্কোরবোর্ডে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল জাপান, আর মাত্র ৪৫ মিনিট দূরে ছিল ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম বড় বিশ্বকাপ বিপর্যয়।
কিন্তু বিরতির পর বদলে যায় পুরো চিত্র। কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তন ও খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ব্রাজিল ২-১ গোলে জয় তুলে নিয়ে নিশ্চিত করে শেষ ষোলোর টিকিট। ম্যাচের ৯৫তম মিনিটে আসে জয়সূচক গোল, যা ছয়বারের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে সেলেসাওদের।
শেষ ৩২-এর এই ম্যাচে শুরু থেকেই সুসংগঠিত ফুটবল খেলতে থাকে জাপান। তারা ব্রাজিলের আক্রমণ ঠেকিয়ে নিজেদের এগিয়ে নেয় এবং প্রথমার্ধ শেষ করে ১-০ গোলের লিড নিয়ে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ২০০২ সালের পর কখনও পিছিয়ে থেকে জয় পায়নি ব্রাজিল। ফলে বিরতির সময় দেশটির সামনে আরেকটি বড় লজ্জার শঙ্কা দেখা দেয়। ১৯৬৬ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল বিশ্লেষক টিম ভিকারি বলেন, জাপানের কাছে শেষ ৩২ থেকেই বিদায় নিলে সেটি ব্রাজিলের জন্য ঐতিহাসিক অপমান হয়ে থাকত।
তবে ম্যাচ শেষে অ্যানচেলত্তি জানান, বিরতির সময় তিনি মোটেও উদ্বিগ্ন ছিলেন না। তার ভাষায়, ‘না, আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম না। আমাদের দলের ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল।’
প্রথমার্ধে কয়েকজন খেলোয়াড় ছন্দ হারালেও বিরতিতে আনচেলত্তি কেবল একটি পরিবর্তন আনেন। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার জায়গায় নামেন এন্দ্রিক। বাকি দল অপরিবর্তিত রেখেই দ্বিতীয়ার্ধে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন ইতালিয়ান এই কোচ।
বিশ্লেষক টিম ভিকারি বলেন, ‘অনেক সময় আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় গুণ হলো অযথা কিছু না করা। চারপাশে যত চাপই থাকুক, তিনি সবসময় শান্ত থাকেন।’
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্রাজিল। ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়ার বদলে তারা বারবার বল তুলতে থাকে জাপানের বক্সে।
প্রথমার্ধে ব্রাজিল ১২টি ক্রস করলেও দ্বিতীয়ার্ধে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮-এ। এই কৌশলেই জাপানের রক্ষণভাগ চাপে পড়ে এবং কর্নার ও ক্রস থেকে একাধিক সুযোগ তৈরি হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় সমতা ফেরান কাসেমিরো। এরপর ম্যাচের যোগ করা সময়ে জাপানের একটি ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রুনো গিমারাইস ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির যৌথ প্রচেষ্টায় আসে জয়সূচক গোল।
আনচেলত্তি বলেন, ‘ফুটবলে ভুল হবেই। কেউই নিখুঁত নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ভুল কাটিয়ে উঠে সামনে এগিয়ে যাওয়া। আজ আমার দল সেটাই করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমার্ধে আমরা লক্ষ্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সেই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি। আমার বিশ্বাস, এটি আমাদের দলের উন্নতিরই প্রমাণ।’
সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ার্নক বলেন, ‘বিরতিতে আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। জাপান বক্সে আসা বলগুলো সামলাতেই পারেনি।’
সাবেক স্কটিশ স্ট্রাইকার ক্রিস সাটনের মতে, ‘আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল সঠিক পথেই এগোচ্ছে। তিনি আবারও দেখিয়ে দিলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে ম্যাচ জিততে হয়।’
নাটকীয় এই জয় ব্রাজিলকে শুধু টুর্নামেন্টেই টিকিয়ে রাখেনি, দলটির আত্মবিশ্বাসও অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় অনুভূতি ছিল স্বস্তি একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।