যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যকর থাকা অবস্থাতেই ইরান ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে বলে নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনের শেষ সপ্তাহ ও জুলাইয়ের শুরুর দিকে ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মেরামত ও নির্মাণকাজের স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে।
স্যাটেলাইট কোম্পানি ভ্যান্টর থেকে পাওয়া চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করেছে পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস)।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের আলামত পাওয়া গেছে তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের তালেগান-২ স্থাপনায়। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটি পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যবহৃত বিস্ফোরক উপাদান সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
২২ জুন ও ৭ জুলাইয়ের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, হামলায় সৃষ্ট বোমার গর্তের চারপাশে খননকাজ, অতিরিক্ত কংক্রিট দিয়ে কাঠামো শক্তিশালী করা এবং স্থায়ী মেরামতের জন্য রড (রিবার) বসানোর কাজ চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো সমঝোতা কার্যকর থাকা অবস্থাতেই পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে তেহরান।
পারচিনের বাইরে ইসপাহানের কাছে অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামের আরেকটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাতেও তৎপরতার প্রমাণ মিলেছে। ২১ জুনের স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে টানেলে যানবাহনের যাতায়াত দেখা গেছে। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাতেও নতুন কার্যক্রম শনাক্ত করেছে সিএনএন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধে কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ ছিল। সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সময়ই ছবিগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তবে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় সেই বিধিনিষেধের কিছু অংশ আবারও কার্যকর হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, নতুন করে দুই দেশের মধ্যে হামলা বিনিময়ের পর যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরান আলোচনায় ফিরে আসার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাতে সম্মত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধবিরতি আর বহাল নেই।
তবে উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা হতে পারে। আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরাও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগে ইরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে যে হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত থাকবে এবং সেখানে আর কোনো হামলার হুমকি দেওয়া হবে না।
স্যাটেলাইট চিত্রে উঠে আসা তথ্য নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। সিএনএনকে এক মুখপাত্র বলেন, পরিচালনাগত নিরাপত্তার স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বা গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেন না।
অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক জ্বালানি সংস্থা রোসাটম জানিয়েছে, তারা ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ধাপে ধাপে তাদের কর্মীদের ফিরিয়ে নিচ্ছে। একই সময়ে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের ব্যবসায়ী আলি আনসারির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তিনি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।