ইরানের সঙ্গে কয়েক মাসের সংঘাত এবং ওয়াশিংটনে নিজের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ অবস্থানের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ফিরে গেলেন সেই আগের জায়গায়, যেখানে তার রাজনৈতিক উত্থানের শুরু। গতকাল মঙ্গলবার তিনি আবার নির্বাচনী প্রচারণার মঞ্চে ফেরেন। লক্ষ্য ছিল, রিপাবলিকান পার্টিকে রূপান্তরিত করা সেই রাজনৈতিক যোদ্ধার পরিচয় পুনরুদ্ধার করা।
এ জন্য তিনি বেছে নেন পেনসিলভানিয়াকে যে অঙ্গরাজ্য দুবার তাকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দিয়েছে এবং যেখানে তিনি এক হত্যাচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান। যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে সমর্থকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প কখনোই প্রচলিত রাজনীতিক ছিলেন না। ২০১৬ সালে তার নির্বাচনী সমাবেশগুলো এমন এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আগমনের ইঙ্গিত দিয়েছিল, যিনি যেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচলিত নিয়মই বদলে দিয়েছিলেন। সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে তিনি নতুন নতুন বক্তব্য তৈরি করতেন এবং যেগুলো সবচেয়ে বেশি সাড়া পেত, সেগুলোই বারবার ব্যবহার করতেন। তবে মঙ্গলবারের সমাবেশে নতুন কিছু উপস্থাপনের চেয়ে অতীতের স্মৃতিচারণই বেশি ছিল।
উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে ট্রাম্পকে সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত দেখা যায়। তিনি নিজের পরিচিত রাজনৈতিক কৌশলের পুরো ভাণ্ডারই উন্মুক্ত করেন। শুল্ক আরোপের মাধ্যমে কর্মসংস্থান রক্ষা ও উৎপাদন খাতে নতুন জাগরণ ঘটানোর দাবি করেন। ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তোলেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আক্রমণ করেন।
আত্মবিদ্রূপাত্মক রসিকতা ও চিরচেনা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তিনি আবারও সেই রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেন, যা ২০১৬ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী সমাবেশগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ট্রাম্পের সমাবেশে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখলে মনে হয়, তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও আবেগেরও।
তবে ট্রাম্পের বড়াইপূর্ণ বক্তব্য, অতিরঞ্জন ও বিতর্কিত মন্তব্য এমন এক রাজনৈতিক ভাষাশৈলীর প্রতিফলন, যা মূলত তার সবচেয়ে অনুগত সমর্থকদের কাছেই গ্রহণযোগ্য। ২০২৬ সালের নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভালো ফল করতে হলে ট্রাম্পকে শুধু তার ‘ম্যাগা’ সমর্থকদের নয়, স্বতন্ত্র ভোটার ও মাঝামাঝি অবস্থানের ভোটারদেরও আকৃষ্ট করতে হবে।
তবে সমস্যা হলো, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আবাসন ব্যয়ের চাপে থাকা আমেরিকানদের জন্য ট্রাম্প তেমন কোনো সুস্পষ্ট সমাধান তুলে ধরেননি। নির্বাচনসংক্রান্ত আইন, বিকল্প জ্বালানি কিংবা অভিবাসন ইস্যু নিয়ে কথা বললেও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের জন্য তার বক্তব্যে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না।
সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে ৭০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, অর্থনীতি সামলাতে ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনও দাবি করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য দায়ী ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যাবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যদিও যুদ্ধ শুরুর আগেই লাখো আমেরিকান একই অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিলেন।
মঙ্গলবারের সমাবেশে তার নীতির পক্ষে সবচেয়ে কার্যকর যুক্তি এসেছে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নয়, বরং তার সমর্থকদের কাছ থেকে। বেথলেহেম পুলিশ বিভাগের সার্জেন্ট স্যাম এলিয়াস, যিনি ছয় সন্তানের জনক, বলেন, ওভারটাইম আয়ের ওপর কর কমানোর নীতির কারণে তার পরিবারের জীবন অনেক সহজ হয়েছে। আগে যেখানে পরিবারের জন্য এক দিনের ভ্রমণই সম্ভব ছিল, এখন তারা জার্সি শোরে রাত কাটিয়ে বেড়াতে যেতে পারছেন।
তবু বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যেন এখন ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতের দিকেই বেশি তাকিয়ে আছেন। মঙ্গলবার তিনি নিজের রাজনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গাটি আবার তৈরি করতে সক্ষম হলেও, তার বক্তব্য এমন মনে হয়েছে যেন তা বর্তমানের জন্য নয়, বরং অতীতের কোনো নির্বাচনের জন্য বেশি উপযোগী। ২০১৬ ও ২০২৪ সালের সফল স্লোগান ও পুরোনো বার্তাগুলো কেবল পুনরাবৃত্তি করলেই হয়তো এবার আর কাজ হবে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।