তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পশ্চিম ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেনসহ একাধিক দেশে ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড, দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ সংকট এবং বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই ইউরোপে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ, ঘনঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, বুধবার দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দিন পার করেছে। দেশটির জাতীয় তাপমাত্রা সূচক (৩০টি স্টেশনের দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রার ভিত্তিতে নির্ধারিত) পৌঁছেছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর আগের দিন মঙ্গলবারও ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও বায়ুপ্রবাহের বিশেষ অবস্থানের কারণে গরম বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকছে, যার ফলে ধীরে ধীরে বাড়ছে তাপমাত্রা। এর সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে এবং অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এদিকে তীব্র গরমের কারণে ফ্রান্সে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও চাপে পড়েছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ফিনিস্তের বিভাগে একটি ট্রান্সফরমারে তাপজনিত ত্রুটির কারণে প্রায় ৬৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার রাতে শুরু হওয়া এই সমস্যার সমাধানে সারারাত কাজ চালানো হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন ছিলেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য ইউরোপের অনেক অবকাঠামো প্রস্তুত নয়।
চরম গরমের কারণে ফ্রান্সে ফ্যান ও এয়ার কন্ডিশনারের বিক্রি হঠাৎ বেড়ে গেছে। দেশটির অধিকাংশ ভবন অতিরিক্ত গরম সহ্য করার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়নি।
বর্তমানে ফ্রান্সের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে রয়েছে। ব্রিটানি থেকে প্যারিস এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে নামার সময় ডুবে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গাড়ির ভেতরে অতিরিক্ত তাপে দুই শিশুরও মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জলবায়ু সংকটের কারণগুলো মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাজ্যেও ভেঙেছে তাপমাত্রার রেকর্ড। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস জানিয়েছে, বুধবার ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
ইংল্যান্ডের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল এবং ওয়েলসে ‘রেড হিট হেলথ অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। ২০২২ সালের পর এ ধরনের সতর্কতা দ্বিতীয়বারের মতো জারি করল কর্তৃপক্ষ। লন্ডন ও দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তীব্র গরমের কারণে ইংল্যান্ডের কিছু স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইউরোস্টারও লন্ডন ও প্যারিসের মধ্যে চারটি ট্রেন চলাচল বাতিল করেছে।
এদিকে ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোম ও মিলানসহ ১৬টি শহরে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা জারি করেছে। স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থাও জানিয়েছে, দেশটিতে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে চলতি সপ্তাহে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, তাপপ্রবাহ এখন আর সাময়িক আবহাওয়া নয়, বরং এটি ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সংকটের রূপ নিচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।