নিউ জার্সিতে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ইকুয়েডরের প্রধান কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা বেষ্টনী টপকে গ্যালারিতে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে ছুটে যান। তাদের জড়িয়ে ধরে আবেগঘন উদ্যাপনে মেতে ওঠেন তিনি। কারণ, জার্মানির বিপক্ষে এই জয় শুধু ইকুয়েডরের নকআউট নিশ্চিত করেনি, হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছে তার কোচের চাকরিও।
ম্যাচের আগে আর্জেন্টাইন এই কৌশলবিদ জানিয়েছিলেন, দল যদি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তিনি পদ ছেড়ে দেবেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। যদি সেটা না হয়, তাহলে আমাকে এমন একটি জায়গা ছাড়তে হবে যেটিকে আমি খুব ভালোবাসি। কিন্তু আমি জানি, এখানে সবকিছুই ফলাফলের ওপর নির্ভর করে।’
গত সপ্তাহে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর বেকাসেসের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছু সমর্থকের বাকবিতণ্ডার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
ম্যাচের অনেকটা সময় এমনই মনে হচ্ছিল, ইকুয়েডর এবং তাদের কোচ—দুজনেরই বিদায়ের ঘণ্টা বেজে যাচ্ছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জার্মানির বিপক্ষে ২–১ গোলের ঐতিহাসিক জয় সবকিছু বদলে দেয়। এই জয়ের ফলে নিজেদের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে ইকুয়েডর।
ম্যাচ শেষে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘ইকুয়েডর যদি এই ম্যাচ না জিতত, তাহলে তার চাকরি থাকত না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া চেয়েছিলেন, আর খেলোয়াড়রা দারুণভাবে তার জবাব দিয়েছে। পরিবারের সদস্য, সমর্থক ও বন্ধুদের সঙ্গে তার উদ্যাপন দেখুন—এটি তার প্রাপ্য ছিল।’
ইকুয়েডরের বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের যাত্রাও সহজ ছিল না। ২০২২ সালে কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া বায়রন কাস্তিয়োকে খেলানোর কারণে দলটির তিন পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল।
এরপর আগের কোচ ফেলিক্স সানচেসের অধীনে ছয় ম্যাচে তিনটি জয় পায় দলটি। কিন্তু ২০২৪ সালে দক্ষিণ আমেরিকার শিরোপা প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর তাকে বরখাস্ত করা হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল বিশ্লেষক টিম ভিকারি বলেন, ‘তারা টাইব্রেকারে হেরেছিল, আর ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ড্রেসিংরুমেই কোচকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তারা কোচদের সঙ্গে খুব কঠোর আচরণ করে।’
বেকাসেসের শুরুটাও ভালো ছিল না। তার প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ১–০ গোলে হারে ইকুয়েডর। তবে এরপর টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থেকে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে রানারআপ হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে দলটি।
বিশ্বকাপে তারা আসে টানা ১৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু শুরুটা ছিল হতাশাজনক। প্রথম ম্যাচে শেষ মুহূর্তে আইভরি কোস্টের কাছে ১–০ গোলে হার এবং পরের ম্যাচে নবাগত কুরাসাওয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর সমর্থকরা কোচের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
তখন বেকাসেসে বলেছিলেন, ‘ইকুয়েডরের সমর্থকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে না পারায় আমি দুঃখিত।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘হয়তো আমার মধ্যে এমন কিছু আছে যা তাদের ভালো লাগেনি, আর সেটি আমি মেনে নিচ্ছি।’
খেলোয়াড় হিসেবে খুব বেশি পরিচিতি না পেলেও কোচিং জীবনে ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন বেকাসেসে। একসময় তিনি হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং চিলির সাফল্যের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
এখন বিশ্বকাপে ইকুয়েডরের ভাগ্য বদলে দিয়ে ৪৫ বছর বয়সী এই কোচ হয়তো নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জন করলেন।
জার্মানিকে হারানোর পর তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো নিজেকে নরকে মনে করি না, আবার স্বর্গেও ভাবি না। আমরা বাস্তবতার মাটিতেই দাঁড়িয়ে আছি এবং সঠিকভাবে চিন্তা করছি।’
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।