বিশ্ব ফুটবলের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ। তবে চলমান বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি লড়াইয়ের পর তাদের একজনের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে যেতে পারে।
পর্তুগালের মিডফিল্ডার ভিতিনিয়া বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রোনালদো ও মদরিচ বিশ্ব ফুটবলের দুই মহান প্রতীক। তবে আগামীকাল আমি চাই, আমার চেয়ে একটু বেশি দুঃখ নিয়ে মাঠ ছাড়ুক মদরিচ।’
রোনালদোর বয়স ৪০, আর মদরিচের ৪১। দুজনেরই এটি শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে বৃহস্পতিবারের ম্যাচটি তাদের একজনের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে যেতে পারে।
দুজন মিলে বিশ্বকাপে খেলেছেন ৪৭টি ম্যাচ। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তারা যৌথভাবে জিতেছেন ছয়টি ব্যালন ডি'অর পুরস্কার, যার মধ্যে পাঁচটিই রোনালদোর। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একই ক্লাবে খেলাকালে চারবার ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপাও জিতেছেন তারা।
ভিতিনিয়া বলেন, ‘রোনালদোর সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রতিদিন তাঁর কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেয়েছি। মদরিচের সঙ্গেও আরও বেশি সময় কাটাতে পারলে ভালো লাগত। যতটুকু দেখেছি, তিনি অত্যন্ত ভদ্র ও আন্তরিক একজন মানুষ। কিন্তু আগামীকাল একজনের যাত্রা শেষ হবেই। আমি চাই সেটি হোক মদরিচের।’
পর্তুগালের কোচ রোবের্তো মার্তিনেস বলেন, ‘এরা এমন দুই ফুটবলার, যাদের মূল্যায়ন জনমতের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়াই তাঁদের বিশেষ করে তুলেছে। চল্লিশ পেরিয়েও মদরিচ অসংখ্য ম্যাচ খেলছেন এবং এখনও দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই কথা আমাদের অধিনায়কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বয়স শুধু একটি সংখ্যা। আসল বিষয় হলো তাঁরা মাঠে কী করছেন এবং ড্রেসিংরুমে কী উদাহরণ তৈরি করছেন।’
চলতি বিশ্বকাপে রোনালদো ও মদরিচ দুজনই নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। তবে বয়সের প্রভাব তাদের খেলায় কিছুটা স্পষ্ট।
রোনালদো পর্তুগালের তিনটি ম্যাচের প্রতিটি মিনিট খেলেছেন এবং দুটি গোল করেছেন। তবে সতীর্থদের জন্য এখনো কোনো গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। অন্যদিকে মদরিচ ২২৯ মিনিট খেলেছেন, পাঁচটি সুযোগ তৈরি করেছেন এবং একটি গোলে সহায়তা করেছেন। তবে মাঝমাঠে বল পুনরুদ্ধার ও দ্বৈরথে আগের মতো আধিপত্য দেখা যায়নি।
দুই কিংবদন্তির চেয়ে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন তাঁদের সতীর্থরা। বিশেষ করে দুই দলের মাঝমাঠের লড়াইকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন দুই কোচই।
পর্তুগালের মাঝমাঠে ভিতিনিয়া, ব্রুনো ফার্নান্দেস, জোয়াও নেভেস, বের্নার্দো সিলভা ও রুবেন নেভেসের মতো তারকারা রয়েছেন। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার হয়ে অভিজ্ঞ মদরিচ ও মাতেও কোভাচিচের পাশাপাশি তরুণ পেতার সুচিচও দারুণ ছন্দে আছেন।
ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেন, ‘মাঝমাঠের লড়াইটাই সবচেয়ে বড় হবে। সম্ভবত সেখানেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। পর্তুগাল দারুণ কারিগরি ফুটবল খেলে। তাই আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে বল নিজেদের দখলে থাকলে কোনো ভুল করা চলবে না। কারণ প্রতিটি ভুলেরই কঠিন শাস্তি দিতে পারে তারা।’
প্রতিযোগিতা শুরুর আগে নিজেদের গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি পর্তুগাল। দুটি ড্রয়ের কারণে তারা দ্বিতীয় হয়ে নকআউট পর্বে উঠেছে। তবে কোচ মার্তিনেসের বিশ্বাস, গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ তাঁর দলকে নকআউট লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেছে।
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা নতুন এক বিশ্বকাপ শুরু করছি। দলের প্রতিটি খেলোয়াড় ক্ষুধার্ত, অনুপ্রাণিত এবং প্রস্তুত। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ সেই প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
ভিতিনিয়ার মতে, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় উন্নতি করতে হবে দলগত খেলায়। দল হিসেবে ভালো খেলতে না পারলে কোনো ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই কাজে আসবে না। তাই আক্রমণ ও রক্ষণ—উভয় ক্ষেত্রেই সম্মিলিত পারফরম্যান্স আরও উন্নত করতে হবে।’
গত বছর দুই দল তিনবার মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানে একটি করে জয় পেয়েছে উভয় দল, আর একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
দালিচ বলেন, ‘আমরা তাদের বিপক্ষে বেশ কয়েকবার খেলেছি। তাদের শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবেই জানি। তবে আগ্রাসী মানসিকতা, শৃঙ্খলা এবং মাঝমাঠে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে খেলতে হবে। নিজেদের খেলার ধরনও বদলাব না। আমার বিশ্বাস, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হবে মাঝমাঠের লড়াইয়েই।’
ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দোমিনিক লিভাকোভিচ বলেন, ‘মদরিচ যেন তাঁর যাত্রা আরও এগিয়ে নিতে পারেন, সে জন্য দল হিসেবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
অন্যদিকে মার্তিনেস বলেন, ‘লুকা মদরিচ বিশ্বের কোটি কোটি তরুণ ফুটবলপ্রেমীর অনুপ্রেরণা। তিনি এবং আমাদের অধিনায়ক রোনালদো—দুজনই দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের ধরে রেখে ফুটবলের প্রকৃত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন।’
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।