মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, স্বস্তি-সংকট, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সবই জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু হঠাৎ কোনো বিপদ নেমে এলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এটি কি আমার কোনো গুনাহের শাস্তি, নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি পরীক্ষা? কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উভয় বিষয়ই ইসলামে উল্লেখ রয়েছে। তাই প্রতিটি বিপদের ক্ষেত্রে একক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া সঠিক নয়।
কোরআন কী বলছে?
আল্লাহ তাআলা সূরা আর-রূমে বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণেই স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যাতে আল্লাহ তাদের কিছু কর্মফলের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’(সূরা আর-রূম: ৪১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের অন্যায়, অবাধ্যতা ও গুনাহ কখনো কখনো দুনিয়াতেই বিভিন্ন ধরনের সংকট ও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এসব বিপদ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা, যাতে সে ভুল থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে তওবা করে।
অন্যদিকে, সূরা আল-বাকারায় আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)
এ আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ঈমানদারদের জীবনও পরীক্ষামুক্ত নয়। বরং ধৈর্য, ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আস্থা যাচাই করার জন্য নানা ধরনের পরীক্ষা আসবে।
তাহলে কোন বিপদ শাস্তি আর কোনটি পরীক্ষা?
এখানেই অনেকের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বাস্তবতা হলো, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জীবনের নির্দিষ্ট বিপদ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে এটি আল্লাহর শাস্তি, নাকি পরীক্ষা। কারণ এ ধরনের নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহই জানেন। নবী-রাসুলগণ ওহীর মাধ্যমে বিশেষ কিছু ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের পরে কোনো মানুষের সেই ক্ষমতা নেই।
অনেক আলেম ব্যাখ্যা করেছেন, একই ধরনের বিপদ একজনের জন্য গুনাহের কাফফারা হতে পারে, অন্যজনের জন্য মর্যাদা বৃদ্ধির পরীক্ষা হতে পারে, আবার কারও জন্য সতর্কবার্তাও হতে পারে। অর্থাৎ একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন উদ্দেশ্যে সংঘটিত হতে পারে।
বিপদে একজন মুমিনের করণীয় কী?
ইসলাম বিপদের কারণ অনুসন্ধানের চেয়ে বিপদের সময় সঠিক আচরণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। প্রথমত, আত্মসমালোচনা ও তওবা। প্রতিটি বিপদ আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ এনে দেয়। নিজের ভুল-ত্রুটি ও গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, বেশি বেশি ইস্তেগফার করা এবং জীবনকে সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা। যদি এটি পরীক্ষা হয়, তবে ধৈর্যই হবে সফলতার চাবিকাঠি। কোরআনে ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ এবং মহান প্রতিদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিপদের সময় 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করারও বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তৃতীয়ত, দোয়া ও নেক আমল বৃদ্ধি। বিপদ মানুষকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাই বেশি বেশি দোয়া, সালাত, সদকা এবং মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা ইসলামের শিক্ষা।
অন্যের বিপদ নিয়ে মন্তব্য কেন অনুচিত?
আমাদের সমাজে প্রায়ই শোনা যায়, কেউ দুর্ঘটনায় পড়লে বা অসুস্থ হলে বলা হয়,‘নিশ্চয়ই আল্লাহর গজব নেমেছে।’ অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বহীন।
কোনো ব্যক্তির বিপদ আল্লাহর শাস্তি, নাকি তার মর্যাদা বৃদ্ধির পরীক্ষা এ সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই। কারণ মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং আল্লাহর ফয়সালা সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান কারও কাছে নেই। বরং একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তার জন্য দোয়া করা এবং সহমর্মিতা প্রকাশ করা।
বিপদ থেকে মুক্তির নামে কুসংস্কার
বিপদের সময় অনেক মানুষ শরিয়তসম্মত উপায়ের পরিবর্তে বিভিন্ন কুসংস্কার বা ভিত্তিহীন বিশ্বাসের আশ্রয় নেয়। কেউ তাবিজ-কবচে অতিরিক্ত নির্ভর করে, কেউ মাজারে মানত করে, আবার কেউ মনে করে নির্দিষ্ট স্থানে অর্থ দান করলেই বিপদ দূর হবে।
ইসলামের শিক্ষা হলো, উপকার ও অপকারের প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই বিপদ থেকে মুক্তির জন্য তার কাছেই দোয়া করতে হবে, বৈধ উপায় অবলম্বন করতে হবে এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা স্থানের নিজস্ব ক্ষমতা আছে এমন বিশ্বাস ইসলামের আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিপদ হতে পারে রহমতেরও কারণ
একজন মুমিন যদি বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন এবং নিজের আমল সংশোধনের চেষ্টা করেন, তাহলে সেই বিপদই তার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে। অনেক সময় বিপদ মানুষকে গাফিলতি থেকে ফিরিয়ে আনে, আল্লাহর দিকে ঝুঁকতে শেখায় এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত করে।
জীবনের প্রতিটি বিপদের প্রকৃত কারণ আমাদের জানা সম্ভব নয়। তাই কোনো বিপদকে নিশ্চিতভাবে শাস্তি বা পরীক্ষা বলে ঘোষণা না দিয়ে একজন মুসলমানের উচিত প্রতিটি সংকটকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। তওবা, ইস্তেগফার, ধৈর্য, দোয়া এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। অন্যের বিপদে বিচারক নয়, বরং সহমর্মী হওয়াই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।