চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের আকাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে একটি ছোট বিমান শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন সিআইটিআইসি টাওয়ারে আঘাত হেনেছে। এ ঘটনায় বিমানের পাইলট নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন।
মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
শুক্রবার বিকেলে বেইজিংয়ের আকাশচুম্বী ১০৯ তলা সিআইটিআইসি টাওয়ারের উপরের অংশে বিমানটি আঘাত হানে। দুর্ঘটনার পর ভবনের কাচের টুকরো এবং বিমানের ধ্বংসাবশেষ শত শত ফুট নিচে রাস্তায় পড়লে অফিস শেষে বাড়ি ফেরা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দুর্ঘটনার ভিডিও ও সংশ্লিষ্ট তথ্য মুছে ফেলা হয়। শুরুতে চীনা সরকারও ঘটনাটি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং সরকারি টেলিভিশন সিসিটিভিও এ বিষয়ে কোনো খবর প্রচার করেনি।
শনিবার স্থানীয় সময় দুপুরে বেইজিং সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম জানায়, একটি এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট দুই আসনের হালকা বিমান উড্ডয়নের সময় একটি উঁচু ভবনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এতে বিমানের একমাত্র আরোহী পাইলট নিহত হন এবং ঘটনাস্থলে ১৩ জন আহত হন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার কারণ তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এটি দুর্ঘটনা নাকি ইচ্ছাকৃত হামলা ছিল, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
সিআইটিআইসি টাওয়ার, যা ‘চায়না জুন’ নামেও পরিচিত, ৫২৮ মিটার উঁচু এবং ২০১৮ সাল থেকে বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে পরিচিত। ভবনটিতে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সিআইটিআইসি গ্রুপ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রয়েছে।
এলাকাটি বেইজিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএফসির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ও এর কাছাকাছি অবস্থিত।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট একটি বিমান ভবনের উপরের অংশে আঘাত করার পর বিমানের ধ্বংসাবশেষ ও লেজের অংশ নিচে পড়ে যাচ্ছে। তবে চীনা কর্তৃপক্ষ দ্রুত এসব ভিডিও ও তথ্য ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেয়।
বেইজিংয়ের বাসিন্দা আন্না নামে এক নারী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্ঘটনার একটি পোস্ট দেখার পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পোস্টটি মুছে ফেলা হয়।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে ‘বেইজিং বিমান দুর্ঘটনা’ লিখে খোঁজ করলেও কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত বিমানের নিবন্ধন নম্বরের ছবির ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, এটি দেশীয়ভাবে তৈরি ‘সানওয়ার্ড এসএ–৬০এল অরোরা’ মডেলের একটি হালকা বিমান, যা একটি স্থানীয় সাধারণ বিমান চলাচল কোম্পানির মালিকানাধীন। প্রতিষ্ঠানটি পাইলট প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত ভ্রমণ এবং আকাশ থেকে আলোকচিত্র সেবাও দিয়ে থাকে।
ঘটনার পর ভবনটি থেকে মানুষজনকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। এলাকায় ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়।
শনিবার সিআইটিআইসি টাওয়ারের আশপাশের কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কেবল যাদের ওই এলাকায় কর্মস্থল রয়েছে, তাদেরই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিংয়ের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত আকাশসীমায় একটি ছোট বিমান কীভাবে প্রবেশ করল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, চীনের রাজধানীতে হালকা বিমান উড্ডয়নের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স উভয়ের অনুমতি প্রয়োজন।
এছাড়া গত মাসে বেইজিংয়ে বিনোদনমূলক উড্ডয়ন এবং ব্যক্তিগত ড্রোন ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা সংবেদনশীল ঘটনার পর তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং সংবাদ প্রকাশে সীমাবদ্ধতা নতুন নয়। এর আগে ২০২২ সালে গুয়াংশি অঞ্চলে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৩২ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাও এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
বেইজিংয়ের এই বিমান দুর্ঘটনাও তাই শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।