মাদারীপুরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রধান শিক্ষক সংকট। জেলার ৫ উপজেলায় ৭২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০১টিতেই নেই নিয়মিত প্রধান শিক্ষক। ফলে এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদেরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বাড়ছে তাদের কাজের চাপ। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। কালকিনির ৮০টির মধ্যে ৬৮টি, রাজৈরের ৭২টির মধ্যে ৬৬টি, শিবচরের ১০৪টির মধ্যে ৭৮টি এবং ডাসারের ৩৩টির মধ্যে ১৯টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক।
অর্থাৎ জেলার ৫৫ শতাংশের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই বর্তমানে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে।
শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, সহকারী শিক্ষক পদেও রয়েছে জনবল সংকট। জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত ৩ হাজার ৭৮২টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩ হাজার ৫৪৭ জন। ফলে এই পদেও ২৩৫টি পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে সাধারণত জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে তাকে একদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হয়, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজও সামলাতে হয়।
মাদারীপুর সদর উপজেলার পৌর অফিসসংলগ্ন মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকরা দাপ্তরিক কাজেও ব্যস্ত।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জীবন নহার আখি বলেন, ২০২৪ সাল থেকে তিনি জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, এই দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি ক্লাসও নিতে হয়। ফলে আগের মতো নিয়মিতভাবে শ্রেণিকক্ষে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।”
একই উপজেলার পুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. আজমল হোসেনও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। রাস্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ উপজেলার আরও বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা গেছে।
শিক্ষক সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। রাস্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাইজা আকতার বলেন, অনেক সময় একজন শিক্ষককে একই সময়ে দুটি শ্রেণি সামলাতে হয়। একটি ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই কখনো অন্য শ্রেণিতে যেতে হয়।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি ইসলাম জানান, প্রায় দেড় বছর ধরে তাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। তিনজন শিক্ষককেই অনেকটা ভাগাভাগি করে সব ক্লাস নিতে হচ্ছে।
এদিকে অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে সন্তানদের পড়াশোনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
সোহাগ শিকদার নামে এক অভিভাবক বলেন, একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রধান শিক্ষক। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তদারকি, নথিপত্র সংরক্ষণ, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়সহ নানা দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের। পদটি শূন্য থাকলে এসব দায়িত্ব সহকারী শিক্ষকদের ওপর বর্তায়। এতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকসংখ্যা কমে গিয়ে পাঠদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অভিভাবক শাহনাজ বেগম বলেন, শিক্ষক কম থাকায় তার সন্তান পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে। বাধ্য হয়ে বাড়িতে আলাদাভাবে পড়াতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিবচর ও রাজৈর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মামলা, শিক্ষক নিয়োগের প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় বিলম্ব এবং পদোন্নতির ধীরগতির কারণে প্রধান শিক্ষক সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
তাদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি এমনিতেই বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকট যুক্ত হলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফজলে এলাহী বলেন, জেলার বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক ছাড়াও ২৩৫টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে শূন্য পদ পূরণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, জেলার প্রায় ৪০০ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ও দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জনবলসংকট কীভাবে কমানো যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।