সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা ৫ অক্টোবর ২০২৬ , ৭:৫১:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রদবদল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ ও অপারগতার বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলেও তা বিবেচনায় না নিয়ে এ রদবদল করা হয়েছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, কয়েকটি বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক অসুস্থতা, বয়স, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতার ঘাটতি এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অপারগতার কথা জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁরা তৎকালীন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদনও করেন। পরে তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র হলেও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম কয়েকজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে সম্প্রতি নতুন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই বিদ্যালয়গুলোতে আবারও পরিবর্তন আনা হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাতুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামপাশা, পশুখালী, দৌলতপুর মডেল, মাইলোড়া, সোনারামপুর, বড়তলী, সামাইকোনা, কমলপুর, মাঘান ও সমাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করে এবং আগের লিখিত আবেদনগুলো বিবেচনায় না নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নয়; বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ, অনলাইনে তথ্য আদান-প্রদান, তথ্য এন্ট্রি, দাপ্তরিক কাজসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব কাজে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, অনেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এসব কাজে তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ। এ ছাড়া কারও কারও চাকরির মেয়াদও শেষের দিকে হওয়ায় অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন তাঁদের জন্য কঠিন হতে পারে।
মাইলোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না এবং এ বিষয়ে তিনি লিখিতভাবে কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন। পরে আলোচনা করে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
খায়রুল ইসলাম বলেন, “আমি নিজেও দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলাম না। তবে বিদ্যালয়ের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আবার চিঠি দিয়ে আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমরা অনিয়ম করে দায়িত্বে ছিলাম। বিষয়টি দুঃখজনক।”
সমাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক খাতেমুন্নাহার বলেন, তিনি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। এ কারণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব না নেওয়ার জন্য তিনি আবেদন করেছিলেন। তাঁর পরিবর্তে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার তাঁকে দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার জন্য বিষয়টি কষ্টকর হবে। তাই শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে কয়েকদিন সময় চেয়েছি।”
অন্যদিকে দৌলতপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেলিম শাহ বলেন, তিনি ওই বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দাবি, দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি।
তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ বলেন, কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে। সেই নিয়ম অনুসরণ করেই ১১টি বিদ্যালয়ে রদবদল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের সব শিক্ষকই যোগ্য। আইটি বা অন্য কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে তাঁরা অফিসের সহকারীদের সহযোগিতা নিতে পারেন। আলোচনা করে জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান করার নিয়ম নেই।”
হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ আরও বলেন, কোনো জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে তাঁকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানাতে হবে। একই সঙ্গে অপারগতার কারণের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দিতে হবে। অসুস্থতার কারণ দেখালে মেডিকেল রিপোর্ট এবং অন্য কোনো কারণ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। এরপর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
দৌলতপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, অন্য বিদ্যালয়গুলোর মতো সেখানেও আলোচনা করে একজন জুনিয়র শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। তবে নিয়ম অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ শিক্ষককেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, শারীরিক সক্ষমতা ও বিদ্যালয়ের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের আশঙ্কা, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা না করা হলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের ওপর।





















