সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে সম্পদ বা ঋণ নেওয়ার সময় তা পরিশোধের সৎ ও দৃঢ় নিয়ত রাখে, আল্লাহ তাআলা নিজ দায়িত্বে তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি তা আত্মসাৎ বা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। তাই ঋণমুক্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো মনে মনে তা দ্রুত পরিশোধের খাঁটি ইচ্ছা রাখা।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, ঋণ থেকে মুক্তি পেতে শুধু মুখে দোয়া করলেই চলবে না; বরং বাস্তব জীবনে মিতব্যয়ী হতে হবে এবং উপার্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। হালাল উপার্জনের অক্লান্ত চেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন মুমিন বান্দা দ্রুত ঋণ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেন।
হজরত আলীর (রা.) কাছে এক ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের জন্য সাহায্য চাইলে তিনি তাকে বলেন, আমি তোমাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিচ্ছি যা আমাকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিখিয়েছিলেন। এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহই তোমার ঋণমুক্তির ব্যাপারে দায়িত্ব নেবেন, যদি তোমার ঋণ পাহাড়সমানও হয়।
দোয়াটি হলো:
اللهم اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عن حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।
অর্থ: হে আল্লাহ! হারামের পরিবর্তে তোমার হালাল রুজি আমার জন্য যথেষ্ট করো। আর তোমাকে ছাড়া আমাকে কারো মুখাপেক্ষী করো না এবং স্বীয় অনুগ্রহ দিয়ে আমাকে স্বচ্ছলতা দান করো। (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৬৩)
ঋণ থেকে মুক্তি পেতে রাসুলের (সা.) শেখানো আরও ৩টি দোয়া
১. রাসুল (সা.) দোয়া করতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল-ফাকরি ওয়াল-কিল্লাতি ওয়াযযিল্লাতি ওয়া আউযুবিকা মিন আন আযলিমা আও উযলামা
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার কম অনুকম্পা ও অসম্মান থেকে এবং আমি কারো প্রতি জুলুম করা থেকে বা নিজে জুলুমের শিকার হওয়া থেকে। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ)
২.রাসুল (সা.) দোয়া করতেন,
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ وَرَبَّ الأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ رَبَّنَا وَرَبَّ كُلِّ شَىْءٍ فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَىْءٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ اللَّهُمَّ أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَىْءٌ وَأَنْتَ الآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَىْءٌ وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَىْءٌ وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَىْءٌ اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বিল-আরশি ওয়া রাব্বি কুল্লি শাইইন ফালিকা-ল হাব্বি ওয়ান-নাওয়া ওয়া মুনযিলাত-তাওরাতি ওয়াল-ইনজিলি ওয়া-ল ফুরকাত আউযুবিকা মিন শাররি কুল্লি শাইইন আনতা আকিযুন বিনাসিয়াতিহি আল্লাহুম্মা আনতাল-আউয়ালু ফালাইসা কাবলাকা শাইউন ওয়া আনতাল-আখিরু ফালাইসা বা’দাকা শাইউন ওয়া আনতায-যাহিরু ফালাইসা ফাওকাকা শাইউন ওয়া আনতাল-বাতিনু ফালাইসা দুনাকা শাইউন ইকযি আন্না-দাইনা ওয়া আগনিনা মিনাল-ফাকরি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আকাশ, জমিন ও মহান আরশের প্রতিপালক। আমাদের প্রতিপালক ও সব কিছুর প্রতিপালক। আপনি বীজ ও উদ্ভিদের সৃষ্টিকর্তা, আপনি তাওরাত, ইনজীল ও ফুরকানের অবতীর্ণকারী। আমি আপনার কাছে এমন সব ধরণের অনিষ্ট থেকে মুক্তি চাই, আপনি যার নিয়ন্ত্রক। হে আল্লাহ! আপনিই আদি, আপনার আগে কোনো কিছু নেই এবং আপনিই অন্ত আপনার পরে কোনো কিছু নেই। আপনি প্রকাশ্য, আপনার ঊর্ধ্বে কেউ নেই। আপনিই অপ্রকাশ্য, আপনার অগোচরে কিছু নেই। আমাদের ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং দারিদ্র্য থেকে আমাদের মুক্ত করে দিন। (সহিহ মুসলিম)
৩. ঋণ থেকে মুক্তি পেতে নবিজি (সা.) সকাল-সন্ধ্যা এ দোয়াটি পড়তে বলেছিলেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিন গালাবাতিদ-দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি চাই। আশ্রয় চাই অপারগতা ও অলসতা এবং কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের কঠোরতা থেকে। (সুনানে আবু দাউদ)
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, একদিন রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে আনসারি সাহাবি আবু উমামাকে (রা.) দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আবু উমামা! মসজিদে বসে আছ কেন? এখন তো নামাজের সময় নয়। আবু উমামা বললেন, ঋণভারে জর্জরিত ও সীমাহীন দুশ্চিন্তার কারণে অসময়ে মসজিদে বসে আছি হে আল্লাহর রাসুল! রাসুল (সা.) বললেন, আমি কি তোমাকে এমন দোয়া শিখিয়ে দেবো, যে দোয়া করলে আল্লাহ তোমার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন? আবু উমামা বললেন, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুল (সা.) তাকে সকালে ও সন্ধায় উল্লিখিত দোয়াটি পড়তে বলেন।
আবু উমামা (রা.) বলেন, আমি এ রকম আমল করি এবং এর ফলে আল্লাহ তাআলা আমার দুশ্চিন্তা দূর করেন, ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। (সুনানে আবু দাউদ)
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।