দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতই বর্তমানে আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
এই সমঝোতা স্মারকে লেবাননে একটি যুদ্ধবিরতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলি হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে লেবাননে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
লেবাননের চলমান সংঘর্ষ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার গতি কমিয়ে দিয়েছে। এতে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুগুলোর সমাধানও পিছিয়ে পড়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি নিয়েও উত্তেজনা বেড়েছে। দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় এবং সুইজারল্যান্ডে রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার পুনরায় শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
লেবাননে কেন যুদ্ধ চলছে?
হিজবুল্লাহ, যা ইরান-সমর্থিত একটি শিয়া ইসলামপন্থি সংগঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনীগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত, বহু দশক ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আছে। ১৯৮০-এর দশকে লেবাননে শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এই সংঘাত শুরু হয়।
হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের অস্তিত্বের বিরোধিতা করে আসছে এবং দেশটির ধ্বংসকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। সংগঠনটি ইরানের সহায়তায় বড় পরিসরের রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের শক্তিশালী ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। যার কারণে ইসরায়েল বহুবার হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০০৬ সালে। সে সময় হিজবুল্লাহ সীমান্ত পেরিয়ে অভিযান চালিয়ে দুইজন ইসরায়েলি সেনাকে আটক করলে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে, যা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে।
একটি স্বাধীন ইসরায়েলি তদন্তে ওই যুদ্ধকে ‘গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল একটি দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু করেছিল, যা শেষ হলেও কোনো স্পষ্ট সামরিক বিজয় অর্জন হয়নি।
হিজবুল্লাহ সেই যুদ্ধ থেকে টিকে যায় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে, ইসরায়েল গাজায় হামাসের হামলার জবাবে গাজায় বোমাবর্ষণ শুরু করলে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলের সীমান্তে রকেট হামলা শুরু করে।
এরপর প্রায় এক বছর ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকে, যার মধ্যে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের নেতা হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যা করে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করে, যেখানে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও ইসরায়েলি বাহিনী কিছু অবস্থান ধরে রাখে এবং প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যায়। হামলা চালানোর কারণ হিসেবে তারা দাবি করে যে হিজবুল্লাহ চুক্তি লঙ্ঘন করছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে বিমান হামলায় হত্যা করার পর নতুন করে সহিংসতার একটি চক্র শুরু হয়। মার্চের শুরুতে, ইরানে ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে গোলাবর্ষণ শুরু করে।
এরপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এ ছাড়া একটি বাফার জোন (নিরাপত্তা অঞ্চল) তৈরির উদ্দেশ্যে লেবাননের ভেতরেও আরো সেনা পাঠায়। এরপর থেকে তারা দক্ষিণ লেবাননের বেশিরভাগ এলাকা প্রায় জনশূন্য করে দিয়েছে এবং বহু গ্রামে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি অভিযানে ২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৪,০৫৭ জন নিহত হয়েছে।
ইরান চুক্তিতে কী বলা আছে?
১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদে লেবাননে সংঘাত বন্ধকে এই চুক্তির একটি প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করবে এবং ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি দেওয়া থেকেও বিরত থাকবে এবং লেবাননের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এই চুক্তির অংশ হিসেবে ‘আমরা সব ফ্রন্টে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি আশা করছি, যার মধ্যে লেবানন, হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
তেহরানের জন্য, এই অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হওয়া সবসময়ই যুদ্ধ শেষ করার দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল।
শুক্রবার সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কূটনীতিক জানান, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর আগে লেবাননে সহিংসতা বন্ধের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় চলা ওই উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা রবিবার আবার শুরু হয়।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সরকারের জন্য হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার জন্য সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যাওয়া একেবারেই অগ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ জোটের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।
ইসরায়েলের ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেন, ‘আমেরিকানদের প্রতি সব সম্মান রেখেও বলতে হয়, ইসরায়েলসহ পুরো বিশ্বকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে যে আমাদের ছেলেদের রক্ত এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনোভাবেই ত্যাগের বিষয় নয়।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন, ইসরায়েল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
তিনি বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমরা উত্তরের (ইসরায়েলের) নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার করব। এর জন্য দক্ষিণ লেবাননে নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখা প্রয়োজন, এবং যতদিন ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রয়োজন দাবি করবে ততদিন আমরা সেখান থেকে সরে যাব না।’
হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা সত্ত্বেও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সংগঠনটি যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকবে।
ইরানের পক্ষেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস এখনো আলোচনার ওপর ছায়া ফেলছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি শনিবার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে আমেরিকার এখনো ইরানি জনগণের আস্থা অর্জনের ইচ্ছা নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স দুইজনই সম্প্রতি লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলা এবং ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থানের প্রতি ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি ও অধৈর্যতা প্রকাশ করেছেন।
ভ্যান্স এই সপ্তাহে বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তাহলে আমি পৃথিবীতে আমার একমাত্র শক্তিশালী অবশিষ্ট মিত্রকেই হয়তো আক্রমণ করতাম না।’ তার এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই বিষয়ে বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি বলেন, ভ্যান্স শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল নিয়ে আলোচনার ধরন বদলাচ্ছেন না, বরং পুরো কূটনৈতিক কাঠামো বা দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিচ্ছেন।
তবে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের এখনো অনেক শক্তিশালী সমর্থক রয়েছে, বিশেষ করে কংগ্রেসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কিছু উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক শক্তিশালী রয়েছে এবং দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
ইরান চুক্তির ভবিষ্যত কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্প কতটা কঠোরভাবে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করাতে চান এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পুরোপুরি সঙ্গে না পেয়েও কতটা চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম হন তার ওপর।
বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিটজ বলেন, লেবাননই এখনো যে কোনো বৃহত্তর সমঝোতার ‘প্রধান বাধা’ হিসেবে কাজ করছে। তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-যুক্তরাষ্ট্র কতটা দূর পর্যন্ত গিয়ে এমন যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করবে, যা দুই পক্ষই ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল লেবাননের সরকারের কাছে বারবার দাবি করছে যে তারা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করুক। কিন্তু এখন পর্যন্ত লেবাননের সেনাবাহিনী তা করতে সক্ষম হয়নি।
আন্তর্জাতিক কৌশল গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইসিসির এমিল হোকায়েম বলেন, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হলো লেবানন সরকার, যারা যুদ্ধবিরতি আলোচনায় কার্যত পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ-সব পক্ষই লেবানন সরকারকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান লেবানন ও হরমুজ ইস্যুকে একসঙ্গে যুক্ত করতে সফল হয়েছে, আর ইসরায়েলের সামরিক-কেন্দ্রিক কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।