প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
চীনা মন্ত্রী এ খাতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন বলেও জানান মুখপাত্র।
আজ বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টায়) সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন জানান, গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের পার্টি-টু-পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এ সময় চীনা পক্ষ দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জনগণের সংযোগ ও পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে বিএনপির সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
মাহদী আমিন জানান, আজ বিকেলে চীনের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায়, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
‘এরপর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ১৫টি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হবে, এগুলো চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও জোরদার করার পথে প্রভাবক হবে বলে আশা করছি। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন’, যোগ করেন মুখপাত্র।
চীনের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘আগামীকাল শুক্রবার চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায়, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবেন।’
এই মুখপাত্র আরও বলেন, চীনে রাষ্ট্রীয় সফরকালে বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন- অগ্রযাত্রায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, মূলত চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের উদ্দেশ্য হলো- বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, প্রথম বিদেশ সফরের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে চীনের দালিয়ানে যান। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাতটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। যেসব দেশের প্রধানমন্ত্রীরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাদের মধ্যে ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টিনিগ্রো, মঙ্গোলিয়া, গিনি এবং কাজাখস্তান।
এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সেখানে সরকার গঠনের পর গত চার মাসে জলবায়ু খাতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন, যা উপস্থিত সুধীবৃন্দের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বে আমরা ‘‘সবার আগে বাংলাদেশ’' নীতিকে মাথায় রেখে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতাকে ভিত্তি হিসেবে ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও গভীর করতেই এই সফর। কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফরে যে মর্যাদা পাচ্ছেন এবং যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন, তা বিশ্ব দরবারে আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার বিষয়।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, সুজন মাহমুদসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।