
সম্প্রতি মেহরিন আহমেদ নামের এক তরুণী তাঁর মা-বাবার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। পেশাগত দায়িত্বে আমি সেই মামলার আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলাম। মামলাটি পরিচালনার সময় আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—এর মূল কারণ ছিল সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে আত্মিক সম্পর্কের অভাব। অপরদিকে, মেয়েটিও তার মা-বাবার ত্যাগ ও ভালোবাসা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ভুল বোঝাবুঝির পরিণতিতেই তাদের শেষ আশ্রয় হয়েছে আদালত।
আমি মনে করি, এই একটি মামলা আমাদের সমাজের হাজারো মা-বাবাকে সতর্ক বার্তা দেবে—প্যারেন্টিং, সন্তানের সঙ্গে মানসিক সম্পর্ক, সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে সচেতন হওয়ার। আমাদের দেশে জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বহু মামলায় প্রতিপক্ষ হয় মা-বাবা বনাম সন্তান। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সন্তানদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত ও সমাজের সম্মানজনক স্তরে অবস্থান করছেন। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধে তাদের অপূর্ণতা চোখে পড়ে। নৈতিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের সূচনা হয় সেই দিন থেকে, যেদিন প্রথম বৃদ্ধাশ্রম চালু হয়।
একটি শিশুর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাকে সময় দেওয়া। শৈশবেই গড়ে ওঠে তার আবেগ, চিন্তা ও মূল্যবোধ। বাবা-মায়ের পক্ষে এটি শুরুতে কঠিন মনে হলেও ধৈর্য ও আন্তরিকতায় একসময় সম্পর্কটি হয়ে ওঠে গভীর, ভালোবাসায় পূর্ণ ও জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দদায়ক একটি অধ্যায়।
স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু পারস্পরিক মমত্ববোধ, হাসিমুখ, ভাষার বিকাশ ও মানবিক আচরণ শেখে। বিপরীতে, প্রতিষ্ঠানে লালিত শিশুরা এসব মৌলিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থাকে। তারা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে আত্মকেন্দ্রিক, উদাসীন এবং অনুভূতিহীন। অনেক মনোবিজ্ঞানী বলেন, শিশুর প্রথম তিন বছর যদি মায়ের উপস্থিতি ছাড়া কাটে, তবে তার মানসিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে উন্নত পরিবেশেও পূরণ হয় না। তবে আদর-যত্ন ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এই শিশুরাও বিকশিত হতে পারে—এমনকি অবহেলিত পরিবারের শিশুর চেয়েও এগিয়ে যেতে পারে।
শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, দামি বাড়ি বা গাড়ি কিনে দেওয়াই সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনের চাবিকাঠি নয়। আত্মিক বন্ধনই পারে সন্তানকে সুশিক্ষিত, সংবেদনশীল ও দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। মনে রাখতে হবে, একজন সন্তানের প্রথম ও প্রধান শিক্ষক তার পরিবার।
মেহরিনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল—তার মা-বাবা তাকে সময় দেননি। মাত্র দুই বছর বয়স থেকেই তিনি গৃহকর্মীর কাছে বড় হয়েছেন। তাঁর নিজের পরিবারের সঙ্গে কোনো আনন্দময় স্মৃতি নেই। এটি নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক।
প্রত্যেক মা-বাবার উচিত—সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, তার সঙ্গে মানসিক সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। মুসলিমদের জন্য কোরআন ও হাদিসের আলোকে সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় শিক্ষার দায়িত্ব মা-বাবার ওপরই বর্তায়। এ ধরনের শিক্ষা সন্তানকে করে তোলে মানবিক, সহানুভূতিশীল ও নৈতিকভাবে দৃঢ়চেতা।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খাদ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তার পাশাপাশি খেলাধুলা, আনন্দ-বিনোদন ও ধর্ম-সংস্কৃতির চর্চাও প্রয়োজন। তবেই গড়ে উঠবে পরিপূর্ণ মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।
সন্তানের প্রতিটি প্রশ্ন, আবদার, কৌতূহল বা খুনসুটি—এসবের মধ্য দিয়ে তাকে সঠিক-ভুল শেখানো মা-বাবার দায়িত্ব। প্রয়োজনে শাসন করলেও ভালোবাসা যেন কখনো অনুপস্থিত না হয়।
একইসাথে সন্তানদেরও বোঝা উচিত—মায়ের স্নেহ বা বাবার আদর জীবনের দুঃখ দূর করতে যে শক্তি রাখে, তা পৃথিবীর আর কোনো কিছুতে নেই। মা-বাবার ওপর রাগ এলে তাদের ত্যাগ, ভালোবাসা ও শৈশবের আনন্দময় স্মৃতিগুলো মনে আনুন। দেখবেন, সেই রাগ ধুয়ে-মুছে যাবে, এবং আপনিও তাদের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবেন। আপনার এই ইতিবাচক মনোভাব মা-বাবাকেও স্পর্শ করবে, এবং পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে উঠবে আরও দৃঢ় ও মধুর।
আইনজীবী হিসেবে আমাদের কখনো সন্তানের, কখনো মা-বাবার পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে হয়—যা একজন মানুষ হিসেবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিবারের ভেতরে আলোচনার মাধ্যমে এসব ভুল বোঝাবুঝির সমাধান হওয়া উচিত। আদালত পর্যন্ত গড়ানো কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়।
পরিশেষে বলব, আমাদের আচরণ হোক বিনয়ী, মমতাময় ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। আমাদের সাফল্যের সূচনা হোক মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতা দিয়ে।
লিখেছেন: অ্যাডভোকেট ইসফাকুর রহমান গালিব
আইনজীবী, জেলা, মহানগর ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।