তীব্র গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতন হলেও রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার যমুনেশ্বরী নদীতে অবৈধ বালু লুট বন্ধ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বালু লুটের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না; বরং আগের চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে চলছে বালু উত্তোলন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশ, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় এই বালু লুট অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যমুনেশ্বরী নদীর নাটারাম এলাকা থেকে শুরু করে নাগেরহাট ব্রিজ পর্যন্ত অন্তত ১৭টি পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে আবাদি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। পাশাপাশি মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে মিঠাপুকুর–ফুলবাড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের একমাত্র সংযোগকারী নাগেরহাট ব্রিজ। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে প্রতিদিন সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব।
স্থানীয়রা জানান, যমুনেশ্বরীতে বালু লুটের শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। সে সময় নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমানে পলাতক কয়েকজন আওয়ামী নেতা। তাদের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব নেয় একটি নতুন চক্র। প্রথমে এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতার কথিত মামা এ কাজে জড়ালেও স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে তিনি সরে যান। বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন বিএনপির তিনজন প্রভাবশালী নেতা বালু লুটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং পুরো কার্যক্রম দেখভাল করছেন ডলার শাহ নামে এক ব্যক্তি।
তার সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট না হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধুমাত্র অর্থের জোরে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কাজে সহযোগিতা করছেন ইউনিয়ন বিএনপির আরেক নেতা অহিদুল। ফলে দিন-রাত বিরামহীনভাবে চলছে বালু উত্তোলন। ভয়ে অনেকেই মুখ না খুললেও এলাকার শতাধিক তরুণ একত্রিত হয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন এবং উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএসএম শাহাদাত হোসেন একাধিক অভিযান চালিয়ে বালু পরিবহনে জরিমানা করেন এবং কয়েকটি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করেন। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব অভিযানের পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
কুতুবপুর ইউনিয়নের অরুন্নেছা বাজার এলাকার বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় জাহাঙ্গীর আলম ও মোরশেদ আলম পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে বালু লুট করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “প্রতিদিন পুলিশকে ম্যানেজ করেই পয়েন্ট চালাতে হয়। আমি একা নই, আরও অনেকেই বালু তুলছে। নাগেরহাট এলাকার হাফিজুর মন্ডলসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা, এমনকি বাগানপাড়ার জামায়াতকর্মী আক্কাছ আলী ও সোনারপাড়ার আরও অনেকে এই কাজে জড়িত। এনিয়ে যা খুশি লিখতে পারেন।”
অন্যদিকে নাগেরহাট ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ডলার, সোহাগ ও বিপ্লবসহ কয়েকজন বালু উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা দাবি করেন, আন্দোলন করে কোনো ফল হয়নি।
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএসএম শাহাদাত হোসেন বলেন, “বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যেখানে অবৈধ বালু উত্তোলন হবে, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধি—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, “নাগেরহাট এলাকায় আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে।”
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।