
সিলেটে সম্প্রতি ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় এ চক্রের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরী নারীর পরিচয়ে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে প্রথমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হয়। পরে কৌশলে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। প্রতিবাদ করলে হামলা, মিথ্যা মামলা ও সামাজিক হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
এ ঘটনায় সিলেট জেলা মহানগর যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লাকি আক্তার ওরফে লাকি আহমেদ এবং সহ-প্রচার সম্পাদক খাদিজা বেগমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাব খাটিয়ে দক্ষিণ সুরমার এক যুবককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করেন লাকি আক্তার। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন।
অন্যদিকে, খাদিজা বেগম সিলেট নগরীর পূর্ব স্টেডিয়াম মার্কেটের একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ‘স্বপ্না ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড হিজামা সেন্টার’-এ কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক স্বপ্না বেগম অভিযোগ করেন, খাদিজার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অবগত হয়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি সিলেট পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একটি লাইভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লাকি আক্তার ও খাদিজা বেগমের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর তারা সংঘবদ্ধভাবে ব্ল্যাকমেইল চক্র পরিচালনা শুরু করেন। তাদের সহযোগী হিসেবে হবিগঞ্জের বাপ্পী নামে এক যুবকসহ কয়েকজন অনলাইন লাইভারও জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করাই ছিল তাদের প্রধান কৌশল।
এদিকে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে হানি ট্র্যাপ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুই নারী ও দুই পুরুষ রয়েছেন। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে এক ভিকটিমকে।
শনিবার (১১ এপ্রিল ২০২৬) ভোর ৪টার দিকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ভিকটিমের অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি প্রাইভেটকার, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন কানাইঘাট উপজেলার আজিজুল হক ওরফে বাবুল মিয়ার মেয়ে তানজিলা আক্তার ওরফে রাবেয়া বেগম তানহা (২৭), নগরীর মিরাবাজার এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে জেসমিন আক্তার (২২), মোগলাবাজারের গঙ্গানগর এলাকার মো. জায়েদ আহমদ (৩৫) এবং গোয়াইনঘাট উপজেলার আব্দুল জলিল (৩০)।
পুলিশ জানায়, গত ৯ এপ্রিল এসএমপির মেন্দিবাগ এলাকা থেকে মাহমুদুল হাসান রিফাত (২৫) ও তার বন্ধু মাহফুজ আলীকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে যতরপুর এলাকার নবপুষ্প-১১৩ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের জিম্মি করে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখানো হয় এবং ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন চালানো হয়।
একপর্যায়ে তাদের জোরপূর্বক উলঙ্গ করে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এ ঘটনায় নারী সদস্য জেসমিন ও তানহাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরে ভিকটিম মাহমুদুল হাসান রিফাত আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে পরিবারের সদস্যরা কোতোয়ালী থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম জানান, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।