
আপনার ব্যবহৃত হেডফোন, স্মার্টওয়াচ কিংবা ভিডিও গেমের কন্ট্রোলারগুলো কীভাবে কোনো তারের সংযোগ ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে? এই অদৃশ্য প্রযুক্তির কারিগর হলো ব্লুটুথ। মূলত এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসকে তারহীন উপায়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে।
ব্লুটুথ প্রযুক্তি রেডিও তরঙ্গের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। রেডিও তরঙ্গ এক ধরনের তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ, যা আলো, তাপ কিংবা এক্সরের মতোই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে শক্তি পরিবহন করতে সক্ষম। এই তরঙ্গের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি তথ্য বহন করতে পারে। এই অদৃশ্য তরঙ্গের মাধ্যমেই গান, ছবি কিংবা বিভিন্ন ডেটা এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে আদান-প্রদান করা হয়। যেমন, আপনি যখন ফোন থেকে গান শোনেন, তখন মিউজিক প্লেয়ার রেডিও তরঙ্গের সহায়তায় সেই গান হেডফোনের কাছে পাঠায়। প্রতিটি ব্লুটুথ-সক্ষম ডিভাইসের ভেতরে একগুচ্ছ ছোট কম্পিউটার চিপ থাকে, যা এই রেডিও তরঙ্গ পাঠানো এবং গ্রহণ করার দায়িত্ব পালন করে।
ব্লুটুথের মাধ্যমে দুটি ডিভাইসকে যুক্ত করার প্রাথমিক প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় পেয়ারিং। এটি অনেকটা দুজন মানুষের প্রথমবার পরিচিত হওয়ার মতোই। ডিভাইস দুটি হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একে অপরকে চিনে নেয় এবং তথ্য বিনিময়ে সম্মত হয়। একবার পেয়ারিং সম্পন্ন হয়ে গেলে ডিভাইসগুলো একে অপরকে মনে রাখতে পারে। ফলে পরবর্তী সময়ে নতুন করে আর পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ডিভাইসগুলো অন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বর্তমানে ব্লুটুথের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০০ কোটিরও বেশি ব্লুটুথ ডিভাইস বিক্রির তথ্য রয়েছে। হেডফোন, তারবিহীন গেম কন্ট্রোলার, স্মার্টফোন, ফিটনেস ট্র্যাকার থেকে শুরু করে গাড়ির অডিও সিস্টেম—সবখানেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত।
ব্লুটুথের নামকরণের ইতিহাসটিও বেশ চমৎকার। দশম শতাব্দীর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাজা হ্যারল্ড ব্লুটুথ গর্মসনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। রাজা হ্যারল্ড যেভাবে নর্ডিক অঞ্চলের বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করেছিলেন, এই প্রযুক্তিও ঠিক সেভাবে বিভিন্ন ডিভাইসকে একত্রিত করে। এমনকি ব্লুটুথের যে লোগো আমরা দেখি, সেটিও রাজার নামের আদ্যক্ষরের (H এবং B) দুটি প্রাচীন নর্ডিক প্রতীক বা রুন জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
অনেকেই ব্লুটুথ ও ওয়াই-ফাইকে এক মনে করলেও এদের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। দূরত্ব, শক্তি ও গতির দিক থেকে এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ব্লুটুথ সাধারণত ৩০ ফুটের মধ্যে কাজ করে, যেখানে ওয়াই-ফাই ৩০০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি দূরত্বে কাজ করতে সক্ষম। ফাইল আদান-প্রদান বা দ্রুতগতির ইন্টারনেটের জন্য ওয়াই-ফাই সেরা হলেও, ব্লুটুথ খুব কম শক্তি খরচ করে, যা ব্যাটারিচালিত ডিভাইসের জন্য আদর্শ। গান শোনা বা সাধারণ ফাইল শেয়ারিংয়ের মতো মাঝারি গতির কাজের জন্য ব্লুটুথ ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে হাই-ডেফিনিশন ভিডিও দেখার মতো উচ্চগতির কাজের জন্য ওয়াই-ফাই প্রয়োজন হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক, এটিএম রাকিবুল বাসার কর্তৃক প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।