মোঃ শাহ্ আলম মন্ডল, দিনাজপুর প্রতিনিধি ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:২৬:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি মনোবল—যা শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেও হার মানায়। সেই অদম্য মনোবলের অনন্য উদাহরণ দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার হিলি পৌরসভার ছোট ডাঙ্গাপাড়ার অন্ধ আব্দুল মাবুদ। দু’চোখের দৃষ্টি হারালেও নিজের আত্মসম্মান ও পরিশ্রমে টিকে আছেন তিনি; অন্যের দয়া নয়, নিজ পরিশ্রমই তাঁর জীবনের অবলম্বন।
৬৫ বছর বয়সী আব্দুল মাবুদ জন্ম থেকেই দুর্বল দৃষ্টিশক্তি নিয়ে বড় হয়েছেন, এখন সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন। স্ত্রীকে নিয়ে ছোট সংসার তাঁর। ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে নিজেরা অনাহারে থেকেছেন, পরিশ্রম করেছেন, তাদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। অথচ আজ সেই সন্তানেরাই তাঁদের খোঁজ রাখেন না, নেই কোনো শ্রদ্ধা বা দায়িত্ববোধ।
প্রতিদিন সকাল হলে কাঁধে থলে ঝুলিয়ে বেরিয়ে যান বাদাম, বুট, কটকটি আর মিঠাই বিক্রি করতে। মাঠপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, চারমাথা, মহিলা কলেজ, চুড়িপট্টি—হিলি পৌর এলাকার নানা জায়গায় তিনি ভাঙরি বা ছেঁড়া জিনিসের বিনিময়ে এই পণ্যগুলো বিক্রি করেন। নিজের ঘাম–ঝরানো আয়েই সংসার চালান, কারও কাছে হাত পাতেন না।
চোখে কিছুই দেখতে পান না, তবু মনের চোখেই পথ চিনে নেন মাবুদ। কোথাও ভুল হলে আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞাসা করেন, সাহায্য চান, আর মানুষও আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে।
দুপুরে প্রায়ই তাঁকে দেখা যায় হাকিমপুর থানার মসজিদে নামাজ আদায় করতে। নামাজ শেষে মসজিদের বারান্দায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় কিছু মানবিক পুলিশ সদস্যের, যারা প্রয়োজনে তাঁর পাশে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাউফুল ইসলাম, রাসেদুল ইসলাম ও এনামুল হক বলেন, “অন্ধ মাবুদ আর তাঁর স্ত্রীকে প্রায়ই দেখি বস্তা নিয়ে হাঁটতে। বয়সের ভার আর দুঃখে তাঁরা কাঁপছেন, কিন্তু কখনও হাত পাতেন না। নিজের শ্রমেই জীবন চালান।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে অন্ধ মাবুদের স্ত্রী বলেন, “আমরা ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি, কিন্তু আমাদের কপালে কষ্টই লেখা। এখনো কষ্ট করে জীবন চালাচ্ছি।”
আব্দুল মাবুদ বলেন, “ছেলেটারে মানুষ করতে পারিনাই, নিজে না খাইয়া তারে খাইয়াছি। লেখাপড়া দিছি, বিয়া দিছি, কিন্তু এখন সে খোঁজ নেয় না। বাঁচতে তো হইবো, তাই দেখি না তয় ফেরি করি, কামাই দিয়া চলি। কষ্ট আছে, তবু শান্তি আছে—কারও কাছে হাত পাতি না।”
হাকিমপুর থানার ওসি নাজমুল হক বলেন, “প্রায়ই দেখি তিনি থানার মসজিদে নামাজ পড়েন। একদিন তাঁর জীবনগল্প শুনে স্তব্ধ হয়ে যাই। অর্থের অভাব নয়—ভালোবাসা ও সম্মানের অভাবই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট। আমরা তাঁকে সাহায্য করেছি এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকব।”
অধিকাংশ মানুষ যেদিন সন্তানদের সুখে থাকার জন্য জীবনের সব ত্যাগ করে, সেদিন অন্ধ মাবুদের মতো মানুষ আমাদের শেখায়—অন্ধকারেও আলো খুঁজে নেওয়া যায়, যদি মনোবল থাকে। তবু সন্তানসন্ততির উদাসীনতায় এমন প্রবীণদের কষ্টে থাকা কেবল পারিবারিক নয়, আমাদের সমাজেরও গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।




















