সারাদেশ

৫০ কোটি টাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দুই বছর ধরে অচল

  সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা: ৩১ আগস্ট ২০২৬ , ৮:২৯:০০ প্রিন্ট সংস্করণ


নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মভিটায় নির্মিত প্রায় ৫০ কোটি টাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি গত দুই বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে। ভবন ও অবকাঠামো থাকলেও নেই নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। জনবল সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম লুটপাটের ঘটনায় কেন্দ্রটি এখন অনেকটাই প্রাণহীন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

মোহনগঞ্জ পৌর কার্যালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে বাহাম গ্রামে সোয়া দুই একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি। ২০২৩ সালের ১১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রটিতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়নি।

নেত্রকোনা জেলা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শুধু ভবন, জাদুঘর কিংবা মিলনায়তন দিয়ে জীবন্ত হয় না। নিয়মিত অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং দর্শনার্থীদের আনাগোনার মধ্য দিয়েই একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রাণ পায়। শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এখন সেই প্রাণেরই অভাব।

গত ২৫ আগস্ট সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটির প্রধান ফটক বন্ধ। পরে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের পর মোহাম্মদ সামিউজ্জামান নামে কেন্দ্রটির টেকনিশিয়ান এসে ফটকের তালা খুলে দেন।

কেন্দ্রে প্রবেশ করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন পরিচর্যার অভাবে বিভিন্ন স্থানে ঘাস ও লতাপাতা জন্মেছে। ভবনের গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষের ছাদের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। মিলনায়তনের বিভিন্ন সরঞ্জাম নেই। লিফট অকেজো হয়ে আছে। বিভিন্ন কক্ষে থাকা পাঁচটি এসি অকার্যকর এবং অন্তত ৫৩টি বাতি নষ্ট।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্র থেকে বৈদ্যুতিক পাখা, চেয়ার, টেবিল, ঝাড়বাতি, বিভিন্ন ধরনের বাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, আইপিএস, কম্পিউটার, মনিটর, বাদ্যযন্ত্র, বজ্রনিরোধক যন্ত্র ও অডিটোরিয়ামের কন্ট্রোল বক্সসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম লুট করা হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে লুট হওয়া কিছু সরঞ্জাম ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত বিভাগ কেন্দ্রটি নির্মাণ করে। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ কোটি টাকা এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পটিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা। পাশাপাশি নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা ও উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। উদ্বোধনের পর প্রথম এক বছরে কয়েকটি অনুষ্ঠান হলেও গত দুই বছরে কেন্দ্রটির কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।

২৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলা থেকে কেন্দ্রটি দেখতে আসা সংস্কৃতিকর্মী মো. সানোয়ারুজ্জামান বলেন, এত টাকা খরচ করে এত সুন্দর স্থাপনা করা হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। এটি খুবই দুঃখের বিষয়। কেন্দ্রটি সচল করতে পরিচালনা কমিটির যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জানা গেছে, কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২১ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক এ কমিটির সভাপতি এবং মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছে। কিন্তু গত তিন বছরে একটি সভারও আহ্বান করা হয়নি। যে কমিটি কেন্দ্রটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেটিই যদি কার্যকর না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সচল হবে কীভাবে।

জনবল সংকটও কেন্দ্রটির কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউএনও আমেনা খাতুন জানান, কেন্দ্রটিতে অনুমোদিত ৩৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন, টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী জয় হরিচরণ।

দুই কর্মীর বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খাতে মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা রয়েছে বলেও জানান ইউএনও। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলে ওই তহবিলে অর্থ দিতে পারে। কেন্দ্রের প্রবেশ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। কেন্দ্রটিকে কীভাবে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

১৯০০ সালের ১৯ জুলাই মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট সাধক, শিক্ষক ও স্বরলিপিকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘গীতাম্বুধি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি প্রদান করে।

শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনীগ্রন্থের প্রণেতা সঞ্জয় সরকার বলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নির্মাণ করায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল, এটি সংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এটি এখন অচলায়তনে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্রের এই সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাক। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিকে সচল করা হোক।

আরও খবর

Sponsered content