প্রতিনিধি ১৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১১:০৫:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শাস্তি হিসেবে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সম্প্রতি পাস হওয়া বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে বাধা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার রাতে জারি করা এক নির্বাহী আদেশে তিনি নিষেধাজ্ঞাগুলোর কিছু অংশ স্থগিত রাখার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ কথা উল্লেখ করেন।
গত সেপ্টেম্বরে নিষেধাজ্ঞা বিলটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। রোববার থেকে আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি করবে ওয়াশিংটন। আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর এই পরিকল্পনা আইনপ্রণেতাদের বিস্মিত করেছে এবং দুই দলের মধ্যেই সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আইনটির নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের এই সিনেটর মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। গত ১১ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
আইনটির লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলা। এতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতার ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ব্যাপক ক্ষমতা ট্রাম্পকে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ চীন ও ভারত।
এ ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দেশটির সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে আইনটিতে। বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে ব্যবহৃত রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ তেলবাহী জাহাজগুলোকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুই দলের ২০ জন মার্কিন আইনপ্রণেতা ট্রাম্পকে একটি চিঠি দিয়ে নতুন আইনটি যথাযথভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানান। ১৮ অক্টোবর আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
চিঠিতে আইনপ্রণেতারা নিষেধাজ্ঞা বিলে স্বাক্ষর করার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে আইনটির ‘পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়নের’ আহ্বান জানান তারা।
তাদের ভাষ্য, এই আইন ‘পুতিনকে শান্তি আলোচনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে निर्णায়ক ভূমিকা’ রাখতে পারে। তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে ‘গ্রাহাম আইনের নিষেধাজ্ঞাগুলো সর্বোচ্চ মাত্রায় এবং বিলম্ব ছাড়াই প্রয়োগের’ আহ্বান জানান।
ভার্জিনিয়ার কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ারসহ ডেমোক্র্যাট নেতারা ইতিমধ্যে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প মস্কোর কাছে নতি স্বীকার করছেন এবং ইউক্রেন ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাশ থেকে সরে যাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বেয়ার লিখেছেন, ‘পুতিনের কাছে ট্রাম্পের সর্বশেষ আত্মসমর্পণ আবারও আমাদের ইউক্রেনীয় অংশীদারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসী যুদ্ধের শাস্তি দিতে প্রণীত আইনের বিষয়ে কংগ্রেসের স্পষ্ট অভিপ্রায়কেও এটি অগ্রাহ্য করেছে।’
গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প জানান, পুতিনের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছে এবং মস্কো থেকে ডিজেল কেনার বিষয়ে তারা সম্মত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম, বিশেষ করে ডিজেলের দাম, ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন মার্কিন ভোটারদের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে চান ট্রাম্প।
ডিজেল আমদানির এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও। তাদের আশঙ্কা, এতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া সুবিধা পেতে পারে।
আগামী মাসে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় মিত্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির কয়েক শ সেনা পোল্যান্ডে বড় ধরনের সামরিক মহড়ায় অংশ নেবেন।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, ‘ইউক্রেনের যে সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রয়োজন হবে, তাতে সহায়তা দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি কি না, তা নিশ্চিত করতেই এই মহড়া।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির চুক্তিকে পুতিনের জন্য উপহার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি ‘এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগ, যে যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন’।
গত ১১ অক্টোবর রোববার ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি ‘অবিলম্বে কার্যকর’ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। তবে তিনি বলেন, রাশিয়া হামলা বন্ধ করলে কিয়েভও হামলা বন্ধ করবে। অন্যদিকে, মস্কো জানায়, এমন কোনো চুক্তিতে তারা কখনো সম্মত হয়নি। এরপরও রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রাখে। তিন দিন পর কিয়েভও আবার হামলা শুরু করে।
এর জেরে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ইউক্রেন। রাশিয়ার তেল শোধনাগারে কিয়েভের হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। জবাবে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি শুধু ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছি।’
সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। ইউক্রেনের আত্মরক্ষায় দেশটির সামরিক বাহিনীর জন্য এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মঙ্গলবার রাতে নেটওয়ার্কটির গতি কমে যাওয়ার সময় রাশিয়া ইউক্রেনে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলা চালায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউক্রেন সরকার জানিয়েছে, এসব হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।
শুক্রবার জেলেনস্কি নেটওয়ার্কের গতি কমে যাওয়ার ঘটনাকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্বস্তিকর বিস্ময়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, স্টারলিংকের গতি তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে দেশটির সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ রাখা হতে পারে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য এই গোয়েন্দা তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।















