প্রতিনিধি ১ জুলাই ২০২৬ , ২:৪৪:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ
ভূমিকম্পের ক্ষত এখনো না শুকাতেই ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে দেখা মিলেছে এক রহস্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই শহরের আকাশ লালচে-কমলা আভায় ঢেকে যায়। নিচুতে ভেসে থাকা ঘন মেঘের সঙ্গে রক্তিম আলো মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক ভিন্নরকম পরিবেশ, যা দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে অনেকের মনেই এ দৃশ্য নতুন করে আতঙ্কের জন্ম দেয়।
কারাকাসের এই অস্বাভাবিক আকাশের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। কেউ এটিকে অশুভ সংকেত বা নতুন কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, আবার অনেকে একে বিরল হলেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।
যদিও এমন প্রতিক্রিয়ার পেছনে রয়েছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প। গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই ঘটনার পর লালচে আকাশ দেখে অনেকেই নতুন কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একজন ব্যবহারকারী লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলাকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে হবে। কঠিন সময় আসছে। দুর্নীতি, অহংকার, সানতেরিয়া ও জাদুবিদ্যার জন্য তাদের ক্ষমা চাইতে হবে।’
আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘এটি পুরো শহরের ওপর মৃত্যুর সংকেত। হে প্রভু, আপনার মানুষদের রক্ষা করুন।’ অন্য একজন একে ‘কেয়ামত’ বা ‘জগতের শেষ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দৃশ্যের পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃত কারণ নয়, রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
তাদের মতে, রেলি স্ক্যাটারিং এবং সাহারা মরুভূমি থেকে ভেসে আসা অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণার সম্মিলিত প্রভাবে কারাকাসের আকাশে এই লালচে-কমলা আভা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের দৃশ্যকে ‘কান্দিলাসো’ নামেও ডাকা হয়।
সাধারণ অবস্থায় সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে নীল রঙের মতো স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই দিনের বেলায় আকাশ নীল দেখা যায়।
তবে বর্তমানে ভেনেজুয়েলার আকাশে ছড়িয়ে থাকা সাহারার অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা প্রাকৃতিক ফিল্টারের মতো কাজ করছে। এতে নীল আলোর বিচ্ছুরণ আরও বেড়ে যায়, আর দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল ও কমলা রঙের আলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সহজে চোখে পৌঁছায়। ফলে সূর্যাস্তের সময় আকাশজুড়ে সৃষ্টি হয় গাঢ় লাল ও কমলা রঙের অপূর্ব আভা।
বিজ্ঞানীরা এটিকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আবহাওয়াজনিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কারণে অনেক মানুষের কাছে দৃশ্যটি ছিল একই সঙ্গে মনোমুগ্ধকর ও ভীতিকর।
একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘সাহারার ধূলিকণার কারণে সূর্যাস্তের আলো এমন রঙ ধারণ করতে পারে এটি পরিচিত বৈজ্ঞানিক ঘটনা। কিন্তু কারাকাসের আকাশে এমন দৃশ্য সত্যিই শিহরণ জাগায়।’
আরেকজনের ভাষায়, ‘দারুণ সুন্দর, আবার একই সঙ্গে রহস্যময়। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে এক অসাধারণ দৃশ্যের আয়োজন করেছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভবনের পেছনে রক্তিম আকাশের নিচে উদ্ধারকর্মীরা জীবিতদের খুঁজে চলেছেন। সেই দৃশ্য বহু মানুষের মনে গভীর আবেগের সৃষ্টি করেছে।
একজন ব্যবহারকারী লেখেন, ‘বৈজ্ঞানিকভাবে এর ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দৃশ্যকে উপেক্ষা করা কঠিন। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত, শোকে স্তব্ধ এবং হাজারো নিখোঁজ মানুষের দেশের ওপর রক্তিম দিগন্ত ভিন্ন এক অনুভূতি তৈরি করে।’
আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, সাহারা মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধূলিকণার বিশাল মেঘ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। এই ধূলিকণাই আকাশে বিরল এ রঙের সৃষ্টি করেছে। একই ধূলিকণার মেঘ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের আকাশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।




















