প্রতিনিধি ৬ আগস্ট ২০২৬ , ২:২৪:০২ প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য মূল্য বাড়িয়ে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই বার্তা দিয়েছে ইরান। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সূত্রগুলোর মতে, গত ২৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেওয়ার পর তেহরান উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। এর অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করেন।
একজন জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিকের দাবি, আরাঘচি উপসাগরীয় দেশগুলোকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নতুন সামরিক হামলা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ইরানের ওপর নতুন হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি আলোচনায় আরাঘচির বার্তা ছিল একই ইরান জবাব দিতে প্রস্তুত, তবে বৃহত্তর সংঘাত ও ধ্বংস এড়াতে কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র জানায়, ইরানের বার্তা ছিল স্পষ্ট যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চাইছে যে, নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এতে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো ঝুঁকিতে পড়বে, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সূত্রগুলোর দাবি, এই সতর্কবার্তার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রেখে আলোচনায় ফিরে আসা, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ অনুসরণের আহ্বান জানান।
তবে সৌদি আরব একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা সামরিকভাবে জবাব দেবে।
আরেকটি উপসাগরীয় সূত্র জানায়, ইরানের সতর্কবার্তা মূলত সব উপসাগরীয় দেশের জন্যই ছিল, তবে তা প্রধানত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরান সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
ইরানের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন মার্কিন হামলা হলে শুধু তেল স্থাপনা নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ অবকাঠামো, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং তেলক্ষেত্রও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ যদি ইরানের অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তাহলে ইরান তার চেয়ে আরও বড় ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে।’
তিনি ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইসের আরামকো তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। ওই হামলায় দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা সামনে আসে।
এদিকে, কাতার, ওমান ও সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে আবারও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পুরো অঞ্চল ভয়াবহ অস্থিতিশীলতায় নিমজ্জিত হতে পারে।
অন্যদিকে, গত ২ আগস্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হলে তিনি ইরানের ওপর পরিকল্পিত হামলা বাতিল করতে সম্মত হয়েছেন।
তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এমন কোনো সমঝোতা চায়, যা তারা নিজেদের কূটনৈতিক বা সামরিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারে। এই অবস্থানই চূড়ান্ত সমঝোতার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে।





















