আন্তর্জাতিক

ভয়াবহ বন্যায় নিশ্চিহ্ন চীন-নেপাল সীমান্তের গিরং বন্দর

  প্রতিনিধি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৩:২৭:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ

চীন-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় গিরং বন্দর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একসময় পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের ব্যস্ত যাতায়াতের কেন্দ্র এই সীমান্তবন্দর এখন পরিণত হয়েছে পাথর, কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষে ভরা এক বিরান প্রান্তরে। দুর্ঘটনার ১১ দিন পরও সেখানে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।

২৬ আগস্ট বিশাল একটি ভূমিধসের পর সৃষ্ট প্রবল পানির স্রোত প্রথমে গিরং বন্দরে আঘাত হানে। পরে সেই পানির ঢল ও কাদার স্রোত নেপালের দিকে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ভয়াবহ স্রোতের আঘাতে বন্দরের পাঁচতলা সীমান্ত চৌকি, বাজার, ভ্রমণ সংস্থা, সুপারমার্কেট এবং চীন-নেপাল সংযোগকারী একটি সেতুসহ প্রায় সব স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

উদ্ধারকর্মী ঝাং শিয়াওজুন বলেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর তারা শুধু ভবনের ভিত্তির কিছু অংশ দেখতে পেয়েছেন। ওপরের সব স্থাপনা কাদার স্রোতে ভেসে গেছে। এ ঘটনায় বহু চীনা নাগরিক প্রাণ হারানোয় এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে জানান তিনি।

বন্দরটি ছিল নেপালের রাসুয়া বন্দরের ঠিক ওপারে। প্রতিদিন সাধারণত শত শত মানুষ এই সীমান্ত দিয়ে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করতেন। কিন্তু ভয়াবহ দুর্যোগের পর বন্দরে এখন আর কোনো জীবনের চিহ্ন নেই। সেখানে এখনো কোনো জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

দুর্গত এলাকায় প্রবেশের পর চারদিকে ঘন ধুলো ও কুয়াশায় আচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা যায়। বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকারী যান সেখানে অবস্থান করছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়কে চলাচলের উপযোগী করতে কংক্রিটের বদলে পাথর ও নুড়ি বিছানো হয়েছে।

নিহতদের স্মরণে সেখানে অস্থায়ী একটি স্মৃতিস্তম্ভও তৈরি করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর প্রায় ১০০টি হলুদ ফুল দিয়ে সাজানো ওই স্মৃতিস্তম্ভের পাশে বাতাসে উড়ছিল চীনের লাল-সোনালি পতাকা।

উদ্ধারকারী দলের কমান্ডার ইয়াং ছিছিয়াও বলেন, উদ্ধারকাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দুর্গত এলাকার ভয়াবহ পরিবেশ। প্রচুর কাদা ও পলির পাশাপাশি বড় বড় পাথর রয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় দফা ভূমিধসের ঝুঁকিও আছে এবং এলাকার ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা খুবই কম।

চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত দেশটির সীমান্তের অংশে ৪৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৫১৯ জন এখনো নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছেন তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান রেন ওয়েই।

তবে নিখোঁজদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রকাশ করেনি চীনা কর্তৃপক্ষ। এ কারণে নিখোঁজদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার তাদের স্বজনদের শেষ অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাচ্ছে না, তারা দ্রুত তথ্য প্রকাশের দাবি জানাচ্ছে।

রোববার গিরং শহরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিব্বতের কর্মকর্তারা নিখোঁজদের শনাক্তকরণ ও তথ্য প্রকাশের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। কর্মকর্তারা তাদের স্বচ্ছতার অবস্থান তুলে ধরে জানান, উদ্ধার করা মরদেহ শনাক্ত করতে ৬০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ ও তিনটি পরীক্ষাগার কাজ করছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার করা মরদেহ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী নিবন্ধনের পাশাপাশি আঙুলের ছাপ, জেনেটিক তথ্য ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য ও অবস্থান শনাক্তকারী প্রযুক্তির তথ্যও ব্যবহার করা হচ্ছে।

চীনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসকে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এদিকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানোও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তিব্বতের আঞ্চলিক রাজধানী লাসা থেকে উদ্ধারকারী দলকে প্রায় আট ঘণ্টা গাড়িতে ভ্রমণ করে সীমান্তের কাছাকাছি ডিংরি শহরে যেতে হয়েছে। এরপর সেখান থেকে গিরং বন্দরে পৌঁছাতে আরও প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছে।

দুর্গত এলাকায় যাওয়ার সরু সড়কটি পাইনগাছে ঘেরা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে অসংখ্য আঁকাবাঁকা বাঁক পেরিয়ে গেছে। দুর্যোগের সাত দিন পর বুধবার সড়কটি পরিষ্কার করা সম্ভব হয়। এর আগে সীমিতসংখ্যক উদ্ধারকারীকে হেঁটে, নৌযানে অথবা আকাশপথে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে হয়েছিল।

ইয়াং ছিছিয়াও বলেন, সড়ক ভেসে যাওয়ায় তাদের পায়ে হেঁটে পাহাড় পেরিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে হয়েছে।

গত ১১ দিনের উদ্ধার অভিযানে দ্বিতীয় দফা দুর্যোগের আশঙ্কায় বিভিন্ন সময় অভিযান ধীর হয়ে গেছে। ভূমিধসের পাশাপাশি নদীর প্রবাহ কাদা ও ধ্বংসাবশেষে আটকে গিয়ে নতুন ‘বাধ হ্রদ’ তৈরি হওয়ায় সেগুলো ভেঙে আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে আকাশপথেও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়েছে।

উদ্ধারকর্মী ঝাং বলেন, বর্তমানে তাদের প্রধান লক্ষ্য নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানো। ধ্বংসস্তূপ এক স্তর করে সরিয়ে প্রতিটি স্তরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কোনো মরদেহ পাওয়া যায় কি না, তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।

নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের হিমবাহের আশপাশে আরও ধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ওই হিমবাহে ফাটল ও ধস থেকেই ২৬ আগস্টের ভূমিধস ও ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুই দেশের কর্তৃপক্ষের হিসাবে এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্যোগ চীন ও নেপালকে ভবিষ্যতে পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিনিময় এবং আগাম সতর্কতাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ও অনিশ্চিত হয়ে উঠায় সীমান্তবর্তী দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও বাড়ছে।

তবে আপাতত গিরং বন্দরে উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানই প্রধান অগ্রাধিকার। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন চীন ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য পরিবার।

আরও খবর

Sponsered content