ধর্ম

‘বোন তো পরের ঘরের’ এই অজুহাতে হক মেরে দিলে কী হবে?

  প্রতিনিধি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১১:১৯:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো বোন তার প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকারী হলে তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করারও সুযোগ নেই।

অনেক পরিবারে সম্পত্তি ভাগের সময় নানা অজুহাতে নারীদের প্রাপ্য অংশ দেওয়া হয় না। কখনো সামাজিক চাপ, কখনো পারিবারিক বিরোধ, আবার কখনো ‘মেয়েদের তো বিয়ে হয়ে গেছে’এমন যুক্তি দেখিয়ে বোনকে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কোরআনে উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারিত

পবিত্র কোরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সূরা আন-নিসার ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পর্কে বিধান দিয়েছেন। সেখানে ছেলে ও মেয়ের অংশের বিষয়টি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হিসেবে বোনের যে অংশ শরিয়ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সেটি অন্য কেউ ইচ্ছামতো বাতিল বা নিজের দখলে নিতে পারেন না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব পরিস্থিতিতে বোনের অংশ একই হয় না। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের তালিকা, তাদের সম্পর্ক এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর অংশের পরিমাণ নির্ভর করে। তাই নির্দিষ্ট কোনো সম্পত্তির হিসাব জানতে হলে যোগ্য আলেম বা ইসলামি উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

‘মেয়েদের তো বিয়ে হয়ে গেছে’ এটি কি বৈধ অজুহাত?

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বোনকে বলা হয়- তার বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামীর সংসার আছে, তাই বাবার সম্পত্তিতে তার আর দাবি থাকা উচিত নয়। কিন্তু শুধু বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে উত্তরাধিকারীর অধিকার বাতিল হয়ে যায় না। যদি শরিয়ত অনুযায়ী কোনো বোন উত্তরাধিকারী হন, তাহলে তার নির্ধারিত অংশ তার নিজস্ব অধিকার। ভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যরা সেটি নিজেদের ইচ্ছায় নিয়ে নিতে পারেন না।

বোনকে চাপ দিয়ে অধিকার ছাড়ানো যাবে?

কেউ যদি ভয় দেখিয়ে, মানসিক চাপ দিয়ে কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে বোনকে তার প্রাপ্য সম্পত্তি ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। স্বেচ্ছায় ও জেনে-বুঝে কোনো অধিকার ছেড়ে দেওয়া এবং চাপ প্রয়োগ করে কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এক বিষয় নয়। তাই উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর সম্মতি ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা নিষিদ্ধ

কোরআনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি জেনে-শুনে আটকে রাখা, নিজের দখলে নেওয়া বা প্রতারণার মাধ্যমে তা আত্মসাৎ করা শুধু পারিবারিক অন্যায় নয়; এটি ইসলামের দৃষ্টিতেও গুরুতর গুনাহের বিষয় হতে পারে।

হক নষ্ট করলে কী শাস্তি?

কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার-অধিকার অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করলে এর জন্য ‘অমুক নির্দিষ্ট শাস্তি’ এভাবে সাধারণভাবে একটি নির্দিষ্ট দণ্ড নির্ধারণ করা ঠিক নয়। তবে এটি মানুষের হক বা হক্কুল ইবাদ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারও অধিকার নষ্ট করে শুধু মুখে ক্ষমা চাইলেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। যার হক নষ্ট করা হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সম্ভব হলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়াও জরুরি। অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ ফেরত দেওয়াই তওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এড়াতে কী করা উচিত?

উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে আবেগ বা পারিবারিক প্রচলনের পরিবর্তে শরিয়তের বিধান অনুসরণ করা উচিত। কার কত অংশ, তা নির্ধারণের আগে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি, ঋণ, বৈধ ওসিয়ত এবং সব উত্তরাধিকারীর সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হয়। পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সম্পত্তি বণ্টনের সময় বিষয়টি লিখিতভাবে স্পষ্ট করা এবং প্রয়োজন হলে ইসলামি উত্তরাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেম ও আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বোনের প্রাপ্য হককে ‘পারিবারিক বিষয়’ মনে করে উপেক্ষা না করে শরিয়ত অনুযায়ী তার অধিকার নিশ্চিত করাই উত্তম।

আরও খবর

Sponsered content