প্রতিনিধি ১০ অক্টোবর ২০২৬ , ১০:১৬:২৮ প্রিন্ট সংস্করণ
মানবসভ্যতার সূচনাকাল থেকেই সত্যবাদিতাকে সর্বোচ্চ নৈতিক গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে। সত্য বলা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা, আর মিথ্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে- যে ব্যক্তি মুখে মিথ্যা বলেনি, কিন্তু জানা সত্যটিও বলেনি, সে কি দায়মুক্ত? দুটি বিষয় এক নয়। মিথ্যা হলো যা সত্য নয়, তা সত্য বলে প্রকাশ করা। আর সত্য গোপন করা হলো জানা কোনো সত্য প্রকাশ না করা। তবে পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে সত্য গোপন করাও গুনাহের কাজ।
মিথ্যা কী
বাস্তবতার বিপরীত কথা বলাই মিথ্যা। কোনো ঘটনা ঘটেনি জেনেও ‘ঘটেছে’ বলা, কিংবা ঘটেছে জেনেও ‘ঘটেনি’ বলা দুটোই মিথ্যা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সত্য নেকির দিকে পরিচালিত করে, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে বলতে একসময় আল্লাহর কাছে সিদ্দীক হিসেবে লিখিত হয়। আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে বলতে একসময় আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাবাদী হিসেবে লিখিত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৯৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)। তাই মিথ্যা শুধু একটি ভুল কথা নয়। এটি মানুষের চরিত্র, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নীরব থাকা কি মিথ্যা?
কেউ কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিলে বা কোনো তথ্য প্রকাশ না করলে সেটি সরাসরি মিথ্যা নয়, কারণ সে অসত্য কিছু বলেনি। কেউ ব্যক্তিগত কোনো বিষয় জানতে চাইলে ‘এ বিষয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না’ বলা মিথ্যা নয়। তবে বিষয়টি গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন নীরবতার উদ্দেশ্য হয় অন্যকে ধোঁকা দেওয়া, তার অধিকার নষ্ট করা কিংবা তাকে ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দেওয়া।
যখন সত্য গোপন করা গুনাহ
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিওনা না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।’ (সুরা বাকারা: ৪২)
সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে নির্দেশ আরও স্পষ্ট যে ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে তা গোপন করে, তার অন্তর পাপী।’ (সুরা বাকারা: ২৮৩)
লেনদেনের ক্ষেত্রেও সত্য গোপন করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। একবার রাসুলুল্লাহ (স.) খাদ্যশস্যের একটি স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ পেলেন। বিক্রেতা জানালেন, বৃষ্টিতে তা ভিজে গেছে। নবীজি (স.) বললেন, ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ তা দেখতে পায়? এরপর বললেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০২) । বিক্রেতা সরাসরি কোনো মিথ্যা বলেননি। তিনি পণ্যের ত্রুটি আড়াল করেছিলেন। কিন্তু এই গোপন করাই ক্রেতাকে না জানিয়ে বিক্রি করার ক্ষেত্রে প্রতারণার রূপ নিয়েছিল।
যখন নীরব থাকাই উত্তম
এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি জানা কথা সবাইকে বলতে হবে। ইসলাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানুষের সম্মানকেও মূল্য দিয়েছে। কারও গোপন কথা রক্ষা করা মিথ্যা নয়। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলাও ইসলামের শিক্ষার অংশ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
তাই সব সত্য প্রকাশ করা জরুরি নয়। নিজের ব্যক্তিগত বিষয়, অন্যের গোপন কথা কিংবা এমন তথ্য যা প্রকাশ করলে অকারণে কারও ক্ষতি বা অপমান হয়, সেসব ক্ষেত্রে নীরব থাকা দোষের নয়।















