প্রতিনিধি ১৪ আগস্ট ২০২৬ , ৯:৪৯:৪০ প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের বিকল্প হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। লিংকনে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা নাবিকদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং খাদ্য, স্বাস্থ্যসামগ্রী ও ডাক সরবরাহে ঘাটতির খবর প্রকাশের পর নতুন করে ওই রণতরী পাঠানো হচ্ছে। বার্তাসংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
মার্কিন নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের দা নাং বন্দর ছেড়েছে। একটি ক্রুজার ও একটি ডেস্ট্রয়ারসহ রণতরীটিকে পরে সিঙ্গাপুর প্রণালি অতিক্রম করতে দেখা যায়। নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জর্জ ওয়াশিংটন বর্তমানে মালাক্কা প্রণালিতে রয়েছে। এই পথ ধরে এটি ভারত মহাসাগরের দিকে এগোচ্ছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্জ ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর একটি হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হবে। এর ফলে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি থাকবে না।
লিংকন গত ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে এবং জানুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধ শুরু হলে রণতরীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন পর্যন্ত এটি টানা ২৬০ দিনের বেশি সমুদ্রে রয়েছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য রেকর্ডসম সময়ের মোতায়েন।
দীর্ঘ এই মোতায়েন নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ব্যাহত হওয়ায় লিংকনে খাদ্য, স্বাস্থ্যসামগ্রী ও ডাক পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছে বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সামগ্রী এবং সবশেষে ডাককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে জাহাজে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন এবং নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত ও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে চিঠি দিয়ে রণতরীটির পরিস্থিতি সম্পর্কে একাধিক প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির সম্ভাবনার কারণে লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যারিজোনার সিনেটর ও সাবেক মেরিন রুবেন গ্যালেগো জানিয়েছেন, তিনি দুই দলের আইনপ্রণেতাদের নিয়ে লিংকন পরিদর্শনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। নাবিকদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হচ্ছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বিপজ্জনকও বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের অনেকটাই অস্বীকার করেছে পেন্টাগন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেন, লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন’ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে নাবিকদের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদের দেশে ফেরানো ও ক্রু পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগের খবর প্রকাশ পেয়েছে। তবে নৌবাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটিতে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়েছে এমন কোনো প্রবণতা তারা দেখেনি। তবে অপারেশনাল নিরাপত্তা ও রোগীর গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, আগস্টের শুরুতে লিংকন থেকে এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যান। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে জাহাজের মেডিকেল বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে আরও চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি আত্মহত্যার চেষ্টা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করেননি ওই কর্মকর্তা।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও লিংকনের নাবিক ও মেরিনদের সক্ষমতার প্রশংসা করেছে। কমান্ড জানিয়েছে, ২৬০ দিনের বেশি সমুদ্রে থাকা অবস্থায় লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ১০ হাজারের বেশি বিমান উড্ডয়ন পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।
শুধু লিংকন নয়, অন্যান্য মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর দীর্ঘ মোতায়েন নিয়েও আগে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড গত মে মাসে প্রায় ১১ মাসের মোতায়েন শেষে দেশে ফিরেছে, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েনগুলোর একটি। ওই সময় রণতরীটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক অভিযানে সহায়তা করেছিল।
দীর্ঘ মোতায়েনের সময় ফোর্ডে একটি লন্ড্রি এলাকায় আগুনও লাগে। মেরামতের জন্য রণতরীটিকে ভূমধ্যসাগরে ফিরে যেতে হয় এবং এতে শত শত নাবিকের থাকার জায়গা নিয়ে সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়।
এদিকে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরাসরি সংঘাতের তীব্রতা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনী নতুন করে অবরোধ আরোপ করেছে। হেগসেথ জানিয়েছেন, এই অবরোধ ‘অনির্দিষ্টকাল’ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
ফলে জর্জ ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুধু একটি রণতরী বদল নয়, বরং ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নাবিকদের ওপর যুদ্ধের মানসিক চাপ, সরবরাহ সংকট এবং জাহাজের যান্ত্রিক সক্ষমতার ওপর বাড়তে থাকা চাপ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।















