আন্তর্জাতিক

ইন্দোনেশিয়ায় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ২ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী আটকা

  প্রতিনিধি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২:০৩:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ

ইন্দোনেশিয়ায় আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ভয়াবহভাবে ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচল। আগ্নেয়গিরির ছাই ছড়িয়ে পড়ায় দুই হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে দেশজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। আজ সোমবার ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

রাজধানী জাকার্তা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতাউতে শুক্রবার গভীর রাতে নতুন করে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। আগ্নেয়গিরিটি থেকে লাভার ফোয়ারা বের হওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আগ্নেয় ছাই আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছাই জাকার্তা ও লামপুং প্রদেশের আকাশেও পৌঁছে যায়। পুরো সপ্তাহান্তে আগ্নেয়গিরিটি সক্রিয় ছিল।

আকাশে আগ্নেয় ছাই শনাক্ত হওয়ার পর জাকার্তার সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ চারটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দিনের মতো বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।

সোমবার সোয়েকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দরের প্রস্থান টার্মিনালে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কেউ টিকিটের অর্থ ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ কবে থেকে বিমান চলাচল শুরু হবে তার তথ্য জানতে অপেক্ষা করছেন।

পূর্ব জাভার মালাং থেকে রোববার সকালে জাকার্তায় ফেরার কথা ছিল ফিন্নার। বারবার ফ্লাইটের সময় পরিবর্তন হওয়ায় বিমানবন্দরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার বর্ণনা দিয়ে ৪৬ বছর বয়সী এই যাত্রী বলেন, সকালের ফ্লাইটের যাত্রীরা একসঙ্গে জমে যাওয়ায় বিমানবন্দর অত্যন্ত ভিড় হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী ফ্লাইটগুলোর যাত্রীরাও জানতেন না শেষ পর্যন্ত তাদের ফ্লাইট উড়বে কি না। শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা এড়াতে তিনি দুটি আন্তঃনগর ট্রেনে রাতভর ভ্রমণ করে সোমবার ভোর ৩টার দিকে জাকার্তায় পৌঁছান।

ইন্দোনেশিয়া সফরে থাকা পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা ‘সেভ দ্য রাইনো ইন্টারন্যাশনাল’-এর সদস্য জো শ বলেন, আটকে পড়া সবাই বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। আনাক ক্রাকাতাউয়ের সতর্কতা স্তর বাড়ানোর পর তাদের দল জাভার উজুং কুলন জাতীয় উদ্যানে ক্যাম্প করার পরিকল্পনাও বাতিল করেছে।

শ বলেন, কয়েক দিনের জন্য বিমানবন্দরের হোটেলে আটকে থাকা তুলনামূলক ছোটখাটো অসুবিধা। তবে এমন পরিবেশগত পরিস্থিতিতে মাটিতে গণ্ডার নিয়ে কাজ করা দলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বেশি উদ্বিগ্ন।

এদিকে বালিতে এক সপ্তাহের মধুচন্দ্রিমা কাটিয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এক মালয়েশীয় নবদম্পতিও বিপাকে পড়েছেন। তাদের জানানো হয়েছে, কুয়ালালামপুরের পরবর্তী ফ্লাইট ১১ সেপ্টেম্বরের আগে পাওয়া যাবে না।

২৯ বছর বয়সী আমির হামজা মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বারনামাকে বলেন, ‘আরও পাঁচ দিন এখানে কীভাবে থাকব? আমরা শুধু মধুচন্দ্রিমার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সঙ্গে এনেছিলাম এবং গতকালই দেশে ফেরার কথা ছিল।’ কয়েক ঘণ্টা বিমানবন্দরে ঘুমিয়ে সোমবার সকালে দেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও পরিস্থিতি এতটা দীর্ঘ হবে, তারা তা ভাবেননি।

ইন্দোনেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা সোমবার সতর্ক করে বলেছে, আগামী দিনগুলোতে আনাক ক্রাকাতাউতে আরও অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা এখনো বেশি।

দেশটির আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজে জানিয়েছে, আগ্নেয় ছাই জাভা অংশে ৬ হাজার মিটার এবং সুমাত্রা অংশে ১৫ হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠেছে। পশ্চিম জাভার বানতেন প্রদেশের কিছু এলাকাতেও ছাই পৌঁছেছে।

জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝামাঝি সুন্দা প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতাউ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত ৮টা ২৩ মিনিটে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।

অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বিমানবন্দরগুলো কতক্ষণ বন্ধ থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী দুডি পুরওয়াগান্ধি। আবহাওয়ার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে কখন এই পরিস্থিতির অবসান হবে তা নির্ধারণ করা কঠিন বলেও জানান তিনি। আগ্নেয় ছাইয়ের বিস্তার বাড়ছে নাকি কমছে, তা পর্যবেক্ষণে বিমানবন্দরগুলোতে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ সক্রিয় আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের ৩ কিলোমিটারের মধ্যে কাউকে যেতে বা কোনো ধরনের কার্যক্রম চালাতে নিষেধ করেছে। সুন্দা প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে ৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাতের কারণে কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি।

‘ক্রাকাতাউয়ের সন্তান’ অর্থাৎ আনাক ক্রাকাতাউ গত শতাব্দীর শুরুতে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠে। ১৮৮৩ সালের ভয়াবহ ক্রাকাতাউ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হওয়া বিশাল জ্বালামুখের মধ্য থেকেই এর সৃষ্টি। এরপর থেকে আগ্নেয়গিরিটি মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়ে আসছে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আনাক ক্রাকাতাউয়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী সুনামিতে ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন এবং সুমাত্রা ও জাভার উপকূলীয় এলাকায় হাজারো মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন।

আরও খবর

Sponsered content