সিলেট প্রতিনিধি: ১৪ জুন ২০২৬ , ১১:৪২:৪১ প্রিন্ট সংস্করণ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছর পূর্ণ হলো আজ রোববার (১৪ জুন)। ১৯৯৭ সালের এই দিনে সংঘটিত ভয়াবহ মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণ বাংলাদেশের জ্বালানি, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ, পরিবেশ এবং রাষ্ট্র এখনো ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মধ্যরাতে কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া এলাকায় ফুলবাড়ী চা-বাগানের নিকটস্থ ১ নম্বর গ্যাস অনুসন্ধান কূপে খননকাজ চলাকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর আগুনের শিখা প্রায় ৬০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে যায়। টানা ১৫ দিন আগুন জ্বলতে থাকে এবং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস।
১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকারের সঙ্গে মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল অব বাংলাদেশ লিমিটেডের চুক্তি হয়। গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খননের লক্ষ্যে কাজ শুরু করলেও মাত্র ৮৪০ মিটার খননের পরই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
এই বিস্ফোরণে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, চা-বাগান, বিদ্যুৎলাইন, সিলেট-আখাউড়া রেলপথ, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ-কুলাউড়া সড়ক, গ্যাস পাইপলাইন এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে হাজার হাজার বন্যপ্রাণী ও পাখি মারা যায় এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তেল-গ্যাস বিশেষজ্ঞদের মতে, মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ২৪৫ দশমিক ৮৬ বিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাস পুড়ে যায়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় ২৯টি চা-বাগানের প্রায় ৪৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৬৯ দশমিক ৫ হেক্টর এলাকার ২৫ হাজার ৬৫০টি পূর্ণবয়স্ক গাছ পুড়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য, রেলপথ, সড়ক, বিদ্যুৎলাইন এবং স্থানীয় জনগণের ক্ষয়ক্ষতির বিশদ চিত্র উঠে এসেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গ্যাসকূপ খননের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করা, অনভিজ্ঞতা, দায়িত্বে অবহেলা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। জাতীয় তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির দাবি, খননকাজে পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত দায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কার্যকর ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, “বনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হলেও এ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। প্রাকৃতিক বনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোদিন পুরোপুরি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।”
মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে রোববার কমলগঞ্জে বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচি থেকে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কমলগঞ্জের ঘরে ঘরে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।
পরিবেশবাদী ও সচেতন মহলের দাবি, মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির মতো জাতীয় বিপর্যয়ের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।




















