প্রতিনিধি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৯:৩৩:২৮ প্রিন্ট সংস্করণ
আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের ২১ বছর পর, ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী মেসি অবশ্য এর আগেও একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তার সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত বিদায়ের আবহই স্পষ্ট।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সর্বশেষ ম্যাচ ছিল ১৯ জুলাই স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল। ১-০ গোলে হেরে সেই ম্যাচে বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা নিখুঁত হয়নি। তবে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা ইতোমধ্যেই নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে তার অর্জন তাই দিয়েগো মারাদোনার রেখে যাওয়া কিংবদন্তির উত্তরাধিকারকে যথার্থভাবেই ধারণ করে।
সংখ্যার বিচারে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়টি এমন—
# আর্জেন্টিনাকে তিনটি বড় শিরোপা জিতিয়েছেন মেসি—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা।
# আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১৮৫টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। গোল করেছেন ১২৫টি, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬০টি।
# ১২৫ গোলের মধ্যে ১১১টি করেছেন নিজের বিশ্বস্ত বাঁ পায়ে। ডান পায়ে ১২টি, মাথায় দুটি এবং শরীরের অন্য অংশ দিয়ে একটি গোল করেছেন।
# উত্তর আমেরিকায় এবারের বিশ্বকাপে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন মেসি। কিছু সময়ের জন্য শীর্ষেও উঠেছিলেন। পরে তাকে ছাড়িয়ে যান ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে মেসির গোল ২১টি, এমবাপ্পের ২২টি।
# বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি নিয়েছেন মেসি—সাতটি গোল করেছেন এবং তিনটি পেনাল্টি মিস করেছেন। দুই ক্ষেত্রেই তিনি সর্বোচ্চ।
# ইতিহাসে মেসির চেয়ে বেশি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কোনো খেলোয়াড় নেই। তিনি খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপে।
# বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলার সংখ্যাতেও মেসি সবার ওপরে—৩৪টি ম্যাচ। জয় ২৩টি, সহায়তা ১২টি এবং পেনাল্টি এলাকার বাইরে থেকে গোল ছয়টি—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেকর্ডের মালিক।
# ২০১৪, ২০২২ ও ২০২৬—তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে একাদশে থেকে খেলা ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় মেসি। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী মাঠের খেলোয়াড়ও তিনি।
# পুরুষদের বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও মেসির। বিশ্বকাপ, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা আমেরিকা, গোল্ড কাপ, আফ্রিকা কাপ, এশিয়ান কাপ ও ওশেনিয়া কাপ মিলিয়ে তাঁর গোল ৩৫টি।
# ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয়েছিল মেসির। বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ভিলমোস ভানচাককে কনুই দিয়ে আঘাত করার অভিযোগে লাল কার্ড দেখেন তিনি।
# আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি করেছেন ১১টি হ্যাটট্রিক। সর্বশেষটি এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে মেসির তুলনা
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির ১২৫ গোল ও ২০৭ ম্যাচ—দুটিই পুরুষদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২৩৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে দুটিতেই মেসির ওপরে রয়েছেন।
নিজ দেশের হয়ে মেসি জিতেছেন তিনটি বড় শিরোপা—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা। রোনালদোর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা একটি—২০১৬ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়া মেসি ২০২২ সালের ফাইনালিসিমাও জিতেছেন। অন্যদিকে রোনালদো ও পর্তুগাল জিতেছে ২০২৪-২৫ মৌসুমের উয়েফা নেশনস লিগ।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৯ ম্যাচ খেলে রোনালদোর গোল মাত্র একটি, সহায়তা নেই। সেখানে মেসি ১৭ ম্যাচে করেছেন সাত গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১০টি গোল।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচপ্রতি গোলের হিসাবে মেসির হার ৬০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর রোনালদোর ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
মেসির ১২৫ আন্তর্জাতিক গোলের ২৫টি এসেছে পেনাল্টি থেকে, যা রোনালদোর চেয়ে দুটি বেশি।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করেছেন ১২টি। পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর এমন গোল ১১টি।
তবে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে তুলনামূলকভাবে ওপরে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে গোলের হিসাবে রোনালদো কিছুটা এগিয়ে। শীর্ষ ১০ দলের বিপক্ষে মেসির গোল ১৭টি, রোনালদোর ১৮টি। শীর্ষ ২০ দলের বিপক্ষে মেসির ৩২টি, রোনালদোর ৩০টি। আর শীর্ষ ৩০ দলের বিপক্ষে মেসির ৪৯টি, রোনালদোর ৪৬টি।
সংখ্যার হিসাব যতই করা হোক, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের অধ্যায় শেষ হয়েছে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে, যা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, দেশের ফুটবল ইতিহাসেও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।















