অপরাধ

কালকিনিতে সেনা হেফাজতে যুবক নিহত, পরিবারের দাবি নির্যাতন করে হত্যা

   স্টাফ রিপোর্টার , মাদারীপুর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ২:০৮:৩০ প্রিন্ট সংস্করণ

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় সেনা হেফাজতে এক যুবক নিহতের অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবার ও স্বজনদের দাবি, শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। নিহত যুবকের নাম রাসেল কাজী (৩৫)। তিনি কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়নের উত্তর আন্ডারচর গ্রামের বাসিন্দা এবং আলাম কাজীর ছেলে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার একটি সেনা ক্যাম্প থেকে আসা সেনা সদস্যরা রাসেল কাজীকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বাড়ির পাশের একটি কাঁঠাল গাছের সঙ্গে বেঁধে দীর্ঘসময় ধরে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয় তাকে।
নিহতের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের সময় রাসেলের মুখে গামছা গুঁজে রাখা হয় যাতে তিনি চিৎকার করতে না পারেন। পরে তাকে টানতে টানতে পাশের চানমিয়া কাজীর বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানসহ আশপাশের আরও কয়েকটি স্থানে দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। একপর্যায়ে রাসেল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে মুলাদী সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেনা হেফাজতেই তার চিকিৎষা করা হয়।
পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১টার দিকে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন করে জানান, রাসেল মারা গেছেন এবং দ্রুত লাশ গ্রহণ করতে বলেন। তবে পরিবার লাশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ময়নাতদন্তের দাবি জানায়। এ সময় ওই সেনা কর্মকর্তা দাফন-কাফনের জন্য এক লক্ষ টাকা এবং পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখান বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা। এসংক্রান্ত কথোপকথনের একটি মোবাইল রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে, রবিবার নিহত রাসেল কাজীর মরদেহ বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বিকেল বেলা সেনা ও প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার প্রতিবাদে রবিবার দুপুরে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী নিহতের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। মানববন্ধনে অংশ নেন নিহতের বাবা আলাম কাজী, মা ছলেহা বিবি, ভাই কাসেম কাজী, হাশেম কাজী, সোহাগ কাজীসহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
নিহতের স্ত্রী জুলিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “শনিবার ভোরে আমার স্বামীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। কাঁঠাল গাছে বেঁধে নির্যাতন করে, পরে আরও জায়গায় নিয়ে মারধর করা হয়। এই নির্বাচনের সময় আমার স্বামীকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
নিহতের কন্যা রিয়া মনি বলেন,“সকালে আমার বাবাকে বালুর মাঠে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আমি খাবার দিতে গেলে আমাকে খাবার দিতেও দেয়নি।”
নিহতের ভাই হাশেম কাজী বলেন, “আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। পরে আমাদের লাশ নিতে বলা হয় এবং টাকা ও চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়। আমরা কোনো প্রলোভন চাই না, আমরা ন্যায়বিচার চাই।”
এ বিষয়ে কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ উল আরেফিন বলেন, “ঘটনাটি আমরা শুনেছি। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।”
ঘটনার বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট সেনা ক্যাম্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একইভাবে পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তারাও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনাটি আমরা শুনেছি। এটি আমাদের নিয়মিত কোনো অভিযানে নিহত হওয়ার ঘটনা নয়। যদি নিহতের পরিবার আইনগত সহায়তা চায়, তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনি সহযোগিতা দেওয়া হবে।
এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে।

আরও খবর

Sponsered content