বিনোদন

টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে নাগাল্যান্ডের ‘আংহ’-এর চমকপ্রদ সাফল্য

  প্রতিনিধি ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৩:২০:১৭ প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছোট্ট রাজ্য নাগাল্যান্ডের কোন্যাক ভাষার চলচ্চিত্র ‘আংহ’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় সাফল্য পেয়েছে। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি জিতেছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার। স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী ও পরিচালকের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির চলচ্চিত্রকে এই এটি গুরুত্বপূর্ণ জুরি পুরস্কারটি দেওয়া হয়।

নাগাল্যান্ডে নির্মিত ছবিটি কোন্যাক ভাষায় হওয়ায় ভারতের অধিকাংশ দর্শকের কাছেও ভাষাটি অপরিচিত। ছবিটির পরিচালক থেজা রিওর এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। অভিনয়শিল্পীদেরও বেশিরভাগই এর আগে ক্যামেরার সামনে কাজ করেননি। ফলে টরন্টোর মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির এই স্বীকৃতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

জুরি ‘আংহ’-এর ‘সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং আন্তর্জাতিক পর্দায় খুব কম দেখা একটি বিশ্বের চিত্রায়নের প্রশংসা করেছে। পুরস্কারটি ছবিটিকে ২০২৭ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে বিবেচিত হওয়ার একটি সম্ভাব্য পথও তৈরি করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ছয়টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মনোনীত পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নিজ দেশের আনুষ্ঠানিক মনোনয়নের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেও অস্কারে বিবেচনার যোগ্য হতে পারে। তবে এর অর্থ এও নয় যে ‘আংহ’ ইতোমধ্যে অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে।

ছবিটির গল্পের পটভূমি ১৯৬০-এর দশকের শুরুর নাগাল্যান্ড। এতে কোন্যাক একটি গ্রামের বয়স্ক বংশানুক্রমিক প্রধান আহংবা এবং তার তরুণ ছেলের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সেই সময় তাদের চারপাশের সমাজ দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। কোন্যাকরা নাগাল্যান্ডের ১৭টি প্রধান জনগোষ্ঠীর একটি এবং মূলত রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের মোন জেলায় বসবাস করে।

কোন্যাক সমাজে খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বহু পুরোনো বিশ্বাস, আচার ও সামাজিক রীতিতে পরিবর্তন আসে। একসময়কার ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার সঙ্গে নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতার সংঘাত ছবিটির অন্যতম প্রধান বিষয়।

ছবিতে আহংবা তার পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস আঁকড়ে থাকতে চান। কিন্তু তার ছেলে নতুন পৃথিবীর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এমন সময় এক মার্কিন ধর্মপ্রচারক (স্কটিশ অভিনেতা ডগলাস হেনশাল) তাদের এলাকায় আসেন। বাবা ও ছেলের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে অতীত ও বর্তমানের টানাপোড়েন ফুটে ওঠে।

পরিচালক রিও বলেন, কয়েক বছর আগে অন্য একটি কাজের জন্য মোন এলাকায় গিয়ে তিনি এই গল্পের ভাবনা পান। সেখানে তার মনে হয়েছিল, একই পরিবারের ভেতরও যেন বিভিন্ন সময় পাশাপাশি বসবাস করছে। একজন দাদা হয়তো একসময় শিকারি যোদ্ধা ছিলেন, তার মুখে ঐতিহ্যবাহী উল্কি রয়েছে; আবার দুই প্রজন্ম পর তার নাতি রক ব্যান্ডে গিটার বাজাচ্ছেন।

রিও বলেন, ‘মনে হয় যেন টাইম মেশিনে চড়ে এসেছি অতীত ও বর্তমান একই সঙ্গে পাশাপাশি রয়েছে।’

১৯৬০-এর দশক নাগাল্যান্ডের জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ সময়। তৎকালীন আসাম রাজ্যের অংশ নাগাল্যান্ড ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পৃথক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে কয়েক দশক ধরে খ্রিষ্টধর্ম কোন্যাকসহ বিভিন্ন নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল। এর প্রভাব শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসে নয়, সামাজিক রীতি, আচার ও দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে।

কোন্যাক সমাজের গবেষক ড. বি আমো কোন্যাক বলেন, ওই সময়ের পরিবর্তন অনেকটা ‘অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার’ মতো ছিল। কিছু ঐতিহ্য হারিয়ে যায়, আবার কিছু টিকে থাকে বয়স্কদের স্মৃতি বা পারিবারিক সামগ্রীর মধ্যে। একসময়কার দৈনন্দিন জীবনের অংশগুলো ধীরে ধীরে ঐতিহ্যে পরিণত হয়।

তবে তার মতে, কোন্যাক সংস্কৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মানুষ নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও পুরোনো সংস্কৃতির কিছু অংশ বহন করে নিয়ে গেছে। ফলে ঐতিহ্য টিকে থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার অর্থ ও ব্যবহার বদলে গেছে।

এই পরিবর্তনের সময়টিকেই ‘আংহ’-এ তুলে ধরতে চেয়েছেন রিও। সমালোচক সিদ্ধান্ত আদলাখার মতে, ছবিটি অগ্রগতি ও ঐতিহ্যকে সরাসরি পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখায়নি; বরং দুটিকে অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোন্যাক জনগোষ্ঠীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। দীর্ঘদিন ধরে বাইরের পর্যটক, ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা, ধর্মপ্রচারক ও আলোকচিত্রীরা কোন্যাকদের উল্কিচিহ্ন, অলংকার, অস্ত্র ও অতীতের শিরশিকার প্রথার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন জীবন ও মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি অনেক সময় আড়ালে থেকে গেছে।

রিও বলেন, নাগাল্যান্ড নিয়ে নির্মিত অনেক চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রে ‘অনুসন্ধানকারীর দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রাধান্য পেয়েছে। ‘আংহ’-এ তিনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দর্শকদের চরিত্রগুলোর জায়গা থেকে পৃথিবীটিকে দেখতে চেয়েছেন।

এই কাজে কোন্যাক সমাজের পরামর্শদাতারা সংলাপ, পোশাক ও শিল্প নির্দেশনায় যুক্ত ছিলেন। অভিনয়শিল্পীদের বড় অংশও কোন্যাক জনগোষ্ঠীর প্রথমবারের অভিনেতা। ফলে ছবিতে কোন্যাকদের শুধু অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসা, শোক, দ্বন্দ্ব, বিশ্বাস, অনিশ্চয়তা ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ছবিটির দৃশ্যধারণও ছিল বিশেষ। রিও ও চিত্রগ্রাহক অ্যাডাম পিয়েতকেভিচ ‘আংহ’ ১৬ মিলিমিটার ফিল্মে ধারণ করেন। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে নাগা সমাজ ও ধর্মপ্রচারকদের ধারণ করা পুরোনো ছবি ও ভিডিও থেকে তারা দৃশ্যগত অনুপ্রেরণা নেন। লক্ষ্য ছিল সেই সময়ের ছবির দানাদার আবহ ও বুনট ফিরিয়ে আনা, তবে বাইরের মানুষের বদলে কন্যাকদের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলা।

ফিল্মে শুটিংয়ের কারণে নির্মাণকাজে নানা জটিলতাও ছিল। ডিজিটাল ক্যামেরার মতো ধারণ করা দৃশ্য সঙ্গে সঙ্গে দেখা সম্ভব ছিল না। প্রতি চার-পাঁচ দিন পর পর ধারণ করা ফিল্ম মুম্বাইয়ে পাঠিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হতো। ফলে নির্মাতারা কী ধারণ করেছেন, তা জানার আগেই শুটিং চালিয়ে যেতে হয়েছে।

এক রাতে স্কটিশ অভিনেতা হেনশালের সঙ্গে দৃশ্য ধারণের সময় পুরোনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি জিপ ক্যামেরার সামনে আসার কথা ছিল। মহড়ার সময় গাড়িটি ঠিকঠাক চললেও ক্যামেরা চালু হওয়ার পর ইঞ্জিন আর চালু হচ্ছিল না। বহুবার চেষ্টা করার পর শেষ পর্যন্ত মাত্র একবার গাড়িটিকে দৃশ্যে আনা সম্ভব হয়।

প্রথম ছবি হলেও ‘আংহ’-এর সাফল্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চলচ্চিত্র নির্মাণকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সমালোচক আদলাখা আসামের রিমা দাস ও মেঘালয়ের ডমিনিক সাংমার মতো নির্মাতাদের কাজের কথাও উল্লেখ করেছেন, যাদের চলচ্চিত্র ভারতীয় সিনেমার বৈচিত্র্যকে সামনে এনেছে।

রিওর মতে, নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্রশিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্রকেন্দ্রগুলোর মতো সেখানে এখনো তেমন বিস্তৃত সুযোগ বা পরিসর তৈরি হয়নি। তবে ‘আংহ’ ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহের কিছুটা অংশ নাগাল্যান্ডে ফিরে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

রিও বলেন, নাগাল্যান্ডে এমন অনেক প্রতিভাবান নির্মাতা রয়েছেন, যাদের অনেক সুন্দর গল্প এখনো বলা হয়নি।

টরন্টো উৎসবের ব্যস্ততা, সাক্ষাৎকার ও ভ্রমণের পর তার এখন সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা নাগাল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার জন্য। সেখানে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে চান এই তরুণ নির্মাতা।