সম্পাদকীয়

ঢাকার জলাবদ্ধতা: প্রকল্পের ব্যর্থতা, নাকি পরিকল্পনার?

  এটিএম রাকিবুল বাসার সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ ২৭ মার্চ ২০২৬ , ১২:২৩:৪০ প্রিন্ট সংস্করণ

এটিএম রাকিবুল বাসার ,                  সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।
এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা প্রতি বর্ষায় এক পুনরাবৃত্ত দুর্ভোগের নাম। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, অসংখ্য সভা-সমন্বয় সবকিছুর পরও বৃষ্টি নামলেই সড়ক, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত চার বছরে শুধু দুই সিটি করপোরেশনই জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় করেছে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা। তবু পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। প্রশ্ন তাই আরও জোরালো , সমস্যা কি প্রকল্পে, নাকি দৃষ্টিভঙ্গিতে?

জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল নাগরিক দুর্ভোগ নয়; এটি নগর পরিকল্পনার গভীর ব্যর্থতার প্রতীক। নগর কর্তৃপক্ষ জানে কোথায় পানি জমে, কতক্ষণ থাকে, কোন এলাকাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ , তবু স্থায়ী সমাধান অনুপস্থিত। অর্থাৎ সমস্যার তথ্য আছে, কিন্তু সমাধানের দর্শন নেই।

ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল কারণ তিনটি – খাল দখল ও ভরাট, নদীর সঙ্গে খালের বিচ্ছিন্নতা এবং নিম্নাঞ্চলের বিলুপ্তি। একসময় এই শহর ছিল নদী, খাল ও জলাধারের প্রাকৃতিক জালের ওপর দাঁড়ানো। বর্ষার পানি মাটিতে শোষিত হতো, খাল বেয়ে নদীতে নেমে যেত। এখন সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে কংক্রিটের স্তূপে ঢেকে ফেলা হয়েছে। শহরের মাটির পানি শোষণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ থাকার কথা, তা নেমে এসেছে ১৫ শতাংশের নিচে। ফলে সামান্য বৃষ্টিও ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়।

এই ব্যর্থতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ‘বক্স কালভার্ট সংস্কৃতি’। খালকে ঢেকে উন্নয়নের নামে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিই পানিপ্রবাহের পথ রুদ্ধ করেছে। নদীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থাই কার্যকর হতে পারে না। শহরের পানি নামার তিনটি পথ- মাটির মাধ্যমে শোষণ, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক এবং খাল হয়ে নদীতে প্রবাহ- এই তিনটির প্রতিটিই এখন সংকুচিত বা বিচ্ছিন্ন।

এখানেই উঠে আসে নগর শাসনব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন। রাজধানী উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা রাজউক নিম্নাঞ্চল সংরক্ষণের পরিকল্পনা করলেও বাস্তবে সেই এলাকাগুলোতেই গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর ড্রেন পরিষ্কার ও পাম্প স্থাপনে ব্যস্ত থাকে। পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও নজরদারির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় সমস্যার মূল জায়গায় হাত পড়ে না।

এই প্রেক্ষাপটে হাতিরঝিল প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি দেখিয়েছে, জলাধার ও জলপথকে নগর অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করলে একসঙ্গে জলাবদ্ধতা ও যানজট—দুই সমস্যাই কমানো সম্ভব। কিন্তু এমন বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে পুরো শহরের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত জলপথ নেটওয়ার্ক।

ঢাকার জলাবদ্ধতা তাই প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতা নয়; এটি পরিবেশগত ও নীতিগত সংকট। খাল উদ্ধার, নিম্নাঞ্চল সংরক্ষণ এবং নদীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ পুনঃস্থাপন ছাড়া কোনো প্রকল্পই স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। বর্ষার আগে ড্রেন পরিষ্কার করা আসলে রোগের চিকিৎসা নয়, কেবল উপসর্গ কমানো।

এ পরিস্থিতিতে এখনই পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার—

প্রথমত, সব খাল জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার ও পুনঃখনন করতে হবে, এবং দখলমুক্তি নিশ্চিত করতে স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শহরের চারপাশের নদীগুলোর সঙ্গে খালের সরাসরি সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে—নদী গভীর না হলে পানি নামবে কোথায়?
তৃতীয়ত, নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে বাধ্যতামূলক জলাধার ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভবন অনুমোদনে পানি ধারণের শর্ত যুক্ত করা সময়ের দাবি।
চতুর্থত, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একীভূত করতে হবে। প্লাস্টিকে ভরা ড্রেন কোনো দিন কার্যকর হতে পারে না।
পঞ্চমত, নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে—কারণ জলাবদ্ধতা শুধু সরকারের ব্যর্থতা নয়, নাগরিক আচরণও এটিকে তীব্র করে।

সবশেষে, অর্থ ব্যয়ের প্রশ্নটিকে নতুনভাবে দেখতে হবে। হাজার কোটি টাকা খরচ করেও যদি ফল না আসে, তবে সমস্যা অর্থের নয়- সমস্যা পরিকল্পনার, দৃষ্টিভঙ্গির এবং বাস্তবায়নের।

লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ

আরও খবর

Sponsered content