এটিএম রাকিবুল বাসার ৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:৫৬:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিসা বন্ড’ তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া দেশটির নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকে আর্থিকভাবে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে বি-১/বি-২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দেওয়ার শর্ত সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত এক বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—দুই দিক থেকেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এতে একদিকে যেমন বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, অন্যদিকে এটি দেশের জাতীয় মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
ভিসা বন্ড মূলত একটি আর্থিক নিশ্চয়তা ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য ভিসার মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা। যেসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ওভারস্টে করার হার তুলনামূলক বেশি, সাধারণত সেসব দেশকেই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কেউ ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করলে তার জমাকৃত জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। বাংলাদেশের নাম এই তালিকায় যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
বাস্তবতা হলো, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। কয়েক দশকে সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীরা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। কিন্তু ভিসা বন্ড চালু হলে এর প্রভাব হবে বহুমুখী। প্রায় ১৫ হাজার ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১৮ লাখ টাকারও বেশি—এই পরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে দেওয়া বেশিরভাগ পর্যটক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে জরুরি প্রয়োজনে হলেও বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ হারাবেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মর্যাদার প্রশ্ন। ভিসা বন্ড তালিকায় থাকা মানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পাসপোর্ট শক্তি ও কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাঝেও একটি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনই প্রয়োজন প্রো-অ্যাক্টিভ বা আগাম কূটনৈতিক উদ্যোগ। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কাছে পরিসংখ্যান ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে বোঝাতে হবে যে, অধিকাংশ বাংলাদেশি নাগরিক নিয়ম মেনেই ভ্রমণ করেন এবং সময়মতো দেশে ফেরেন। দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে হবে, যাতে অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা কমে। তৃতীয়ত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সতর্কবার্তা। দক্ষ কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার মাধ্যমেই এমন বৈষম্যমূলক নীতি মোকাবিলা করা সম্ভব। আমরা আশা করি, সরকার সময়োচিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করবে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখবে।
লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।





















