ববি বড়ুয়া ৪ নভেম্বর ২০২৫ , ৫:০৫:০১ প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের তরুণরা আজ বিদেশগামী হওয়ার দিকে ঝুঁকছে। একসময় যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই ছিল সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু আজ বিদেশের প্রতি আকর্ষণ শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গবেষণার সীমিত সুযোগ এবং মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব, শিক্ষকসংখ্যার অপ্রতুলতা ও মানের বৈষম্য শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও উদ্ভাবনী শক্তিকে দমন করছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ সীমিত, ফান্ড কম এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আধুনিক মান অনুযায়ী হয়নি, যা শিক্ষার্থীদের হতাশ করছে। ফলে তারা ভাবছে- বিদেশে পড়াশোনা করলে তারা শুধু জ্ঞানই অর্জন করবে না, বরং নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও পাবে। আর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বহু বছরের সমস্যা নিয়ে লড়ছে।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৭০,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মালয়েশিয়া তাদের প্রধান গন্তব্য। গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো- উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার সুযোগ (৩৫%), দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সেশনজট (২৫%), নিরাপদ ও স্বাধীন জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা (২০%), বিদেশে কাজ ও স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা (১৫%), সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাক্সক্ষা (৫%)।
এই পরিসংখ্যান কেবল শিক্ষাগত নয়, সামাজিক মনস্তত্ত্বেরও প্রতিচ্ছবি। আমরা একদিকে যেমন নিজেদের সন্তানকে উন্নত ভবিষ্যৎ দিতে চাই, অন্যদিকে দেশে সেই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
এই মেধাক্ষয় শুধু শিক্ষার নয়- দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশে থেকে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা কম প্রেরণা পাচ্ছে, কারণ দেশের সেরা মেধাবীরা চলে যাচ্ছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেকটাই শিক্ষার মান হ্রাস পাচ্ছে, গবেষণার গতিশীলতা কমে যাচ্ছে এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন স্থবির হচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শিক্ষার্থীদের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়শই রাজনৈতিক সংঘাত ও ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভাবছে- দেশে থেকে উন্নত শিক্ষা অর্জন করা বড় কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এক শিক্ষার্থী বলেছে, ‘আমরা পড়াশোনা করতে চাই; কিন্তু ক্লাস স্থগিত, আন্দোলন, নিরাপত্তাহীনতা- সবকিছু আমাদের স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে।’ এতেই বোঝা যায়-বিদেশে পড়াশোনার প্রবণতা কেবল শিক্ষার মান নয়, বরং নিরাপত্তা, সামাজিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পিতা-মাতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি উড়িয়েও দেয়া যায় না বরং গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে অভিভাবক যেমন তাদের আর্থিক সচ্ছলতার বদৌলতে সহজেই বিদেশে পড়াশোনা করানোর সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি আবার অনেকেই শেষ সঞ্চয়, বন্ধুবান্ধবের সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ করে সন্তানকে বিদেশে পাঠাচ্ছেন। এই দুই শ্রেণির পিতা-মাতার যেমন ছেলে বিদেশে পাঠানোর এবং ভালো সম্ভাবনার কথা ভেবে গর্ব আছে, কিন্তু অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগও আছে । এক পিতা বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে বিদেশে যাবে, এটি আমার গর্ব। কিন্তু তার এই যাত্রা আমাদের দেশের জন্য শেষযাত্রা নয় তো? তারা কি আর ফিরবে? পিতা-মাতা কিংবা দেশের প্রয়োজনে তাদের কি আর কখনও পাওয়া যাবে?’
বিদেশে পড়াশোনার আকর্ষণ শুধু শিক্ষার জন্যই যে তা কিন্তু নয়। বরং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা- সব মিলিয়ে। এ ক্ষেত্রে আমার নিজের কথাও এখানে উল্লেখ করতে পারি। আমার ছেলে সৌর। সে চিটাগং গ্রামার স্কুল থেকে এবার ‘এ’ লেভেল শেষ করবে। ওদের স্কুলের অন্য অভিভাবকদের মতো আমরাও সব সময় চেয়েছিলাম ছেলে বিদেশে যাবে, ভালো ভার্সিটিতে পড়াশোনা করবে। কিন্তু এর মাঝেও আমাদের ভেতর চাপা উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। আমাদের অনেক হিসাব-নিকাশ করে ছেলে পাঠালেও আদৌ সেখানে সে কি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে, না সব টাকা জলেই যাবে? কিন্তু সবকিছুর পরও পাঠাতে চাই, শুধু ছেলের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য।
কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কী হচ্ছে দেশের? মেধাক্ষয় হচ্ছে, মেধা পাচার হচ্ছে। দেশের মেধাবী তরুণরা বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে সেখানেই থেকে যাচ্ছে, যেখানে তারা দক্ষতা অনুযায়ী সম্মান ও নিরাপত্তা পাচ্ছে। দেশে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও দেশের জন্য বিপজ্জনক। বিদেশগামী প্রতিটি মেধাবী তরুণ শিক্ষার্থীর বাস্তব প্রতিফলন- স্বপ্নের পথে বিদেশগমন, তার দেশের জন্য যে অবদান রাখা সম্ভব ছিল, তা আর সম্ভব হচ্ছে না; শুধুই হারানো ছাড়া।
এর পরও আশা রাখি। আশা আছে। সরকারের সুনজরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করলে শিক্ষার্থীরা দেশে থেকেও বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জন করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতিমুক্ত, গবেষণানির্ভর, আধুনিক ও মানসম্মত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষক উন্নয়ন ও গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি অপরিহার্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার্থীদের মনে এই বিশ্বাস জাগানো যে, দেশে থেকেও বিশ্বমানের কিছু করা যায়। তাদের মাঝে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশের তরুণরা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের স্বপ্নপূরণে সহায়তা করা, শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দেশের মেধা বিদেশে না হারানো- এই তিনটি লক্ষ্য অর্জনই দেশের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
পরিশেষে একটি কথা অবশ্যই বলতে হবে এবং মানতেও হবে; তা হলো- পিতা-মাতার এই যে উৎকণ্ঠা, যে উৎকণ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে সন্তানকে বিদেশে পড়াশোনা করানোর হিড়িক পড়েছে; সেসব পিতা-মাতার মনে বিশ্বাস জাগানোর দায়িত্ব অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। সরকারকে অবশ্যই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে দেশে পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, দেশে থেকেও দেশের সন্তানরা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে। তবেই হয়তো দেশ থেকে মেধাপাচার বন্ধ হবে। দেশের সম্পদ দেশে রেখে তাদের ভেতরকার উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ তরুণ প্রজন্মই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ।
ববি বড়ুয়া : প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ওমরগণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম





















