রুশাইদ আহমেদ ১ জুন ২০২৬ , ৬:৫৫:২৫ প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে বসবাস করছি। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ডেটারিপোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪.৩ শতাংশ মানুষ এসব প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ‘সামাজিক’ শব্দটি নামের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এসব মাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বিভেদ, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক সংহতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
মানুষ স্বভাবতই সমাজবদ্ধ জীব। বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে এই বৈশিষ্ট্য আরও সুস্পষ্ট। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও জাতিসত্তার মানুষ এ ভূখণ্ডে পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছে।
কিন্তু রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে কিছু গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বিভাজনের রাজনীতি চর্চা করে আসছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা আরও সহজে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সচেতনতা না বাড়লে সমাজে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও সংঘাত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল ও ট্রেন্ডিং সংস্কৃতি অনেক সময় বিভেদমূলক ও উত্তেজনাকর কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। অধিক প্রতিক্রিয়া ও অংশগ্রহণের কারণে প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমও এসব কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের সামনে নিয়ে আসে।
ফলে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, বৈরিতা ও বিভাজন তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনের উত্তেজনা বাস্তব জীবনের সংঘাতেও রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বহু উদাহরণ দেখা গেছে। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরির চেষ্টা প্রায়ই লক্ষ করা যায়।
এ ছাড়া গণমাধ্যম সাক্ষরতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য শেয়ার করা কিংবা বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে অযথা সম্পৃক্ত হওয়া অনেক সময় গুজব ও অপতথ্যকে আরও বিস্তৃত করে।
সামাজিক মেরুকরণ প্রতিরোধে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, বিভিন্ন মত ও অবস্থানের মানুষের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে। মতভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, গুজব, অপতথ্য ও ঘৃণামূলক কনটেন্ট শনাক্ত এবং প্রতিরোধে দক্ষ তরুণদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম, আলোচনা সভা এবং তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম সাক্ষরতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, নির্ভরযোগ্য উৎস শনাক্ত করতে হয় এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হয়।
সবশেষে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিভাজনের হাতিয়ার নয়, বরং জ্ঞান, সচেতনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, স্থিতিশীলতা ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগোতে পারলেই ডিজিটাল মাধ্যমগুলো প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমুখী শক্তিতে পরিণত হতে পারে।




















