সম্পাদকীয়

বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা

  খায়রুল কবির খোকন ৪ নভেম্বর ২০২৫ , ৫:০২:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

সাবেক রাষ্ট্রনায়ক শহীদ জিয়ার রাজনীতির সার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে দেশ পরিচালনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ধারণ করে সুস্থ গণতন্ত্র, সুশাসন এবং রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবাসীর সঠিক উন্নয়ন কার্যক্রমের যথার্থ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দ্রুততায় এগোচ্ছেন একজন প্রকৃত জাতীয় নেতার অবস্থান অর্জনে- তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ৬ অক্টোবর লন্ডনের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা ‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’ ও বিবিসি বাংলা সর্ভিসকে দুটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন- দীর্ঘ প্রবাসজীবনের যাতনার ও দেশবাসীর জন্য রাজনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ের মাঝে, দীর্ঘ সতেরো বছর পরে; এটা অতিগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এসব সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান যা যা বলেছেন সেসব একজন পোড়খাওয়া, সাহসী, আদর্শবান ও ত্যাগী রাজনীতিকের যথার্থ বক্তব্য- দেশবাসী তথা বিশ্ববাসী বাংলাদেশ-বন্ধুদের নিঃসন্দেহে নতুন ভাবনা, নতুন প্রেরণা দিতে সক্ষম; তাদেরকে নবরাজনৈতিক উত্থানের প্রক্রিয়ায় আশাবাদের উপায় বের করে দিয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ‘মাফিয়া-রাজনীতির দল’ আওয়ামী লীগের প্রায় ষোলো বছরের এবং এর পূর্ববর্তী ‘ওয়ান-ইলেভেন স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের’ দুই বছরের দুঃশাসনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রকৃত গণতান্ত্রিক, আসল জনপ্রতিনিধিত্বশীল একটি দেশপ্রেমিক সরকার আসবে এবং রাষ্ট্রে সুশাসন কায়েম হবে- এই ভেবে দেশবাসী যারা প্রকৃত শান্তিপ্রিয়, উন্নয়নকামী, তারা রাষ্ট্রের ও মানুষের সুদিনের প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ।

তিনি ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন- ‘আগামী নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে অংশগ্রহণের দ্বারা এককভাবে বিএনপির জনভোটে জয়লাভের মাধ্যমে ক্ষমতায় যায়ার ব্যাপারে তিনি দৃঢ়ভাবে আত্মবিশ্বাসী।’ তারেক রহমান অভিমত দেন- বাংলাদেশে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের আশা সম্পূর্ণ হবে না।

তারেক রহমান প্রকৃত আত্মবিশ্বাসের জোরেই বলেছেন- ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, আমরা জয়ী হব। আমরা জোরালোভাবে বিশ্বাস করি যে, এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থায় আমরা রয়েছি।’ এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মানুষও জানে, বিএনপির কোনো বিকল্প নেই; আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় একটা প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও সুশাসনের সরকার গঠনে।

বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা (চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পর এক নম্বর নেতা) তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. ইউনূস যে আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলেন, তার প্রতিধ্বনি করেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি অন্যান্য দলকে (যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী, আওয়ামী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘকাল বিএনপির সঙ্গে রাজপথে পাশাপাশি ছিল) নিয়ে সরকার গঠনে প্রস্তুত। এসব দলের মধ্যে গত বছর গণ-অভ্যুত্থানে সামনের কাতারে থাকা ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দলও (জাতীয় নাগরিক পার্টি ‘এনসিপি’) রয়েছে। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শের নেতা বলেন, ‘আমরা তাদের রাজনীতিতে স্বাগত জানাব; তারা তরুণ, তাদের একটা ভবিষ্যৎ আছে।’

নির্বাচন বিএনপি এককভাবে নাকি জোটগতভাবে করবে- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খুব ট্রিকি কোশ্চেন একটু। দেখুন, প্রায় ৬৪টি রাজনৈতিক দল বিগত স্বৈরাচারের সময়ে যার যার অবস্থান থেকে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম কম-বেশি একসঙ্গে কাজ করার জন্য। এমনকি আমরা যে ৩১ দফা দিয়েছি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের, এটি প্রথমে ২০১৬ সালে আমরা দিয়েছিলাম শুধু বিএনপির পক্ষ থেকে। পরে ‘ভিশন টুয়েন্টি’ ছিল, যেটা পরবর্তী সময়ে কিছুটা ডেভেলপ করে আমরা ২৭ দফা দিয়েছিলাম। পরে আমাদের সঙ্গে যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে (ছিল) তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সকলের মতামত নিয়ে আমরা ৩১ দফা দিয়েছি। কারণটি হচ্ছে- যে দলগুলোকে আমরা পেয়েছি আমাদের সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে, আমরা চাই সকলকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে। সকলের মতামত সঙ্গে নিয়ে আমরা রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে চাই।’

‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’ লিখেছে- ‘তারেক রহমনের বাবা শহীদ জিয়াউর রহমানও বাংলাদেশের আরেকজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে (পাকিস্তানি বর্বর-দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে) তাঁরও অবদান রয়েছে। ১৯৮১ সালে তিনি নিহত হয়েছিলেন।…তারপর তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া কয়েক দশক ধরে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।… তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে নির্বাসনে (যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত) রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয়েছিল (ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার জুলুমবাজির মিথ্যে মামলা)- এগুলোকে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন। তারেক রহমান অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন- নতুন বিএনপি সরকার ‘প্রতিহিংসার বৃত্ত’ ভেঙে দেবে। এ প্রসঙ্গে তিনি গত বছর আগস্ট থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য দলের সাত হাজার সদস্যকে বহিষ্কার বা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের আওতায় আনার (মানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা) কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যে টানাপড়েন চলছে, তা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমান বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ। আমি আগে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ দেখব, আমার দেশের স্বার্থ দেখব, সেসব আপহোল্ড করে আমি যা যা করতে পারব; আমি তা-ই করব।…আমি আমার দেশের পানির ন্যায্য হিসসা চাই, যৌথ নদীগুলোর পানিতে আমাদের দেশের মানুষের যে ন্যায্য হিস্যা তা চাই, সে প্রাপ্যর হিসাব আমার চাই। আমি চাইব না, সীমান্তে কাঁটাতারে আমার দেশের কিশোরী ফেলানীর মতো আর কেউ গুলি খেয়ে প্রাণ হারিয়ে কাঁটাতারের দেয়ালে ঝুলে থাকুক। এই ধরনের আঘাত এলে তা আমি কখনই মেনে নেব না।’

ভারতে শেখ হাসিনার আশ্রয়গ্রহণ প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, ‘তারা (ভারত) যদি ফ্যাসিবাদীদের কাউকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, সেখানে তো আমাদের কিছু করার নেই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল থাকবে। তাই আমাকে আমার দেশের মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে।’

তারেক রহমান বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘বিএনপির একটাই মূলনীতি- সবার আগে বাংলাদেশ। কূটনীতির ক্ষেত্রে বিএনপির নীতি, সবার আগে বাংলাদেশ। আমার জনগণ, আমার দেশ, আমার সার্বভৌমত্ব (বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব)- এটিকে অক্ষুণ্ন রেখে, এটার স্বার্থে সবকিছু বিবেচনা করে, এই স্বার্থকে অটুট রেখে বাকি সবকিছু।’

এটা এখন পরিষ্কার- তারেক রহমান তাঁর পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর রাজনীতির অসমাপ্ত কাজগুলো করার পথে এগোচ্ছেন বিশাল উদ্যম নিয়ে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার ষোলো বছরের স্বৈরাচারী শাসনকালে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেন, আরও নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করেছেন, বিএনপির লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হামলা-মামলা জেল-জুলুম করেছেন এবং অন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে গুম-খুন করেছেন। শেষ পর্যন্ত রাজপথে অন্তত দেড় হাজার জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের কর্মীকে হত্যা এবং ১৩ হাজার (কারও মতে, সংখ্যাটি আরও বড়) কর্মীকে আহত-পঙ্গু করেছে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দানব। মহান আল্লাহ পাকের রহমতে বিএনপি অপরিসীম নিপীড়ন সহ্য করেও টিকে আছে প্রবল জনপ্রিয়তা নিয়ে। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনাবোধ বলে- বিএনপি রাজনীতির ভিত্তি-কাঠামো হতে হবে শহীদ জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত সব কাজের নতুন-আরম্ভ করা। তাঁর স্বেচ্ছাশ্রমে খালকাটা, সমবায়ভিত্তিক গ্রাম উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, দেশব্যাপী নতুন নতুন উদ্যোগের শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণ, ব্যাপক-প্রক্রিয়ায় হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, ভেড়ার খামার সম্প্রসারণ; বিশাল আয়োজনে মাছ ও চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ; আনারস, আম, কাঁঠালসহ সব ফলমূল চাষ থেকে শুরু করে সবধরনের আধুনিক খামার সম্প্রসারণ ইত্যাদি এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদা স্টাডি করে রপ্তানিমুখী পণ্যের শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ।

আমাদের প্রত্যাশা- তারেক রহমান তাঁর পিতার সফল উত্তরাধিকারী হবেন, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার রাজনীতিরও উত্তরাধিকারী হবেন সাফল্যের সঙ্গে। পতিত ফ্যাসিস্ট ‘শেখ গোষ্ঠীর শয়তানীর রাজনীতি’-র বিপরীতে একমাত্র বিকল্প হচ্ছে তারেক রহমানের নতুন-অভ্যুত্থানের রাজনীতি, ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রকৃত গণতন্ত্র ও সুশাসন তথা সার্বিক দেশ-উন্নয়নের রাজনীতি- যা শহীদ জিয়া ও ম্যাডাম খালেদা জিয়ার পরিচালিত গণতন্ত্র-সুশাসনের রাজনীতি, বাংলাদেশকে বিশাল উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আধুনিক চিন্তাভাবনার রাজনীতি। বিএনপির মধ্য-পর্যায়ের নেতা-সংগঠকদেরকে এবং অন্যসব নেতাকে তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে ইস্পাত-কঠিন ঐক্য গড়ে তুলে অবিরাম অগ্রগামী হতে হবে প্রকৃত গণতন্ত্র ও সুশাসন এবং সমৃদ্ধির পথে- প্রবল দেশপ্রেম, মানবপ্রেম আর মানবাধিকার ভিত্তি করে।

খায়রুল কবির খোকন : বিএনপি-এর যুগ্মমহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক

মতামত লেখকের নিজস্ব

আরও খবর

Sponsered content