সম্পাদকীয়

হরমুজের জলরেখা বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের স্রোতধারা

  এটিএম রাকিবুল বাসার ,                  সম্পাদক,  দৈনিক মতপ্রকাশ  । রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।  ৫ মার্চ ২০২৬ , ৬:৪৬:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ

এটিএম রাকিবুল বাসার ,                  সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।
এটিএম রাকিবুল বাসার , সম্পাদক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে ভূগোল কেবল মানচিত্রের রেখা নয়; অনেক সময় সেটিই রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের নীরব নিয়ামক। মানচিত্রের একটি সরু জলরেখা কখনও সাম্রাজ্য গঠন করে, আবার কখনও সাম্রাজ্য ভেঙে দেয়। হরমুজ প্রণালি, মধ্যপ্রাচ্যের বুকে অবস্থিত, আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ।

এই প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত যখন তীব্র আকার নিচ্ছে, তখন এটি কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর সতর্কবার্তা। পাল্টাপাল্টি হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বহুমাত্রিক করেছে। হরমুজ প্রণালি এ অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের মূলধারা।

ইরান যদি এই প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি বা তা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তা জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক ও গভীর প্রভাব ফেলে। এটি কেবল সামরিক কৌশল নয়, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টিরও মাধ্যম। ইতিহাসে সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব যেমন ছিল, তেমনি আজ হরমুজ প্রণালিও একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চোক পয়েন্ট। সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলার খবর এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

জ্বালানি বাজার কেবল সরবরাহ ও চাহিদার হিসাবেই চলেনা; প্রত্যাশা, ঝুঁকি ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াও এর ওপর প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শিপিং খরচ, বীমা প্রিমিয়াম ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি এবং শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা মন্থর হয়। স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি আবারও বেড়ে যায়, যা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

ইউরোপ, চীন, ভারত এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও এই সংকটে বড় ধাক্কা খেতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ক্ষতি, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং শেয়ারবাজারের অস্থিরতা তাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোও দ্বিমুখী পরিস্থিতির সম্মুখীন—উচ্চ তেলের দাম রাজস্ব বাড়াতে পারে, আবার যুদ্ধ ও অবকাঠামো ক্ষতি তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত করতে পারে।

আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। তেলের দাম বৃদ্ধি হলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। পোশাক ও খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।

সংকটের ইতিবাচক দিকও আছে—উচ্চ তেলের দাম নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। দেশগুলো কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি ও বিকল্প রুট উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে চাপ কমবে না।

অতএব, হরমুজ প্রণালি কেবল সমুদ্রের স্রোত নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি। এর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজার স্থিতিশীল থাকে, আর অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক কম্পন সৃষ্টি করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই কম্পনকে তীব্র করে তুলেছে। বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ এখন নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব, কূটনৈতিক সমাধান এবং জ্বালানি নীতির পুনর্বিন্যাসের ওপর। হরমুজ প্রণালার স্থিতিশীলতা রক্ষা না হলে প্রভাব অনুভূত হবে শিল্পোন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল অর্থনীতি পর্যন্ত—কারখানার উৎপাদন লাইনে, শেয়ারবাজারের সূচকে এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলায়।

হরমুজের জলরেখা তাই আজ বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের স্রোতধারা।

 

লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার ,

সম্পাদক,  দৈনিক মতপ্রকাশ  । রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

 

আরও খবর

Sponsered content